খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে এক ঐতিহাসিক রাতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আর্সেনাল। দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং কঠিন পথ অতিক্রম করে শনিবারের এই চূড়ান্ত খেলায় তারা শক্তিশালী প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) বিরুদ্ধে মাঠে নামবে। প্রধান পরিচালক মিকেল আর্তেতার নিখুঁত পরিকল্পনায় ক্লাবের যে নবজাগরণ শুরু হয়েছে, এই প্রতিযোগিতার প্রথম শিরোপার মাধ্যমে তা পূর্ণতা পাবে। ফুটবল বিশ্বের বহুল কাঙ্ক্ষিত এই ম্যাচটি শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় ক্রীড়া বিষয়ক টেলিভিশন চ্যানেল সনি স্পোর্টস ২-তে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
ফাইনালে মাঠে নামার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ম্যানচেস্টার সিটিকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেছনে ফেলে দীর্ঘ ২২ বছর পর নিজেদের প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা ঘরে তুলেছে আর্সেনাল। এই গৌরবময় অর্জনের মাধ্যমে দলটির প্রধান পরিচালক মিকেল আর্তেতার ওপর চেপে থাকা ‘তীরে এসে তরী ডোবা দলের’ দীর্ঘদিনের অপবাদটি সম্পূর্ণ ঘুচে গেছে। ঘরোয়া লিগের এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের ফলে দলের ওপর থেকে অস্বস্তিকর মানসিক চাপ পুরোপুরি কেটে গেছে। ফলে তারা এখন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এই ফাইনালকে একটি অতিরিক্ত বা বোনাস ট্রফি অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখছে, যা জয় করতে পারলে তারা ক্লাবের ২০০৩-০৪ মৌসুমের কিংবদন্তিতুল্য ‘অজেয়’ দলের ঐতিহাসিক কীর্তিকেও ছাড়িয়ে যাবে। তবে বুদাপেস্টের মাঠে লুইস এনরিকের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পিএসজি দলের বিরুদ্ধে জয় পাওয়া সহজ হবে না, কারণ প্যারিসের এই দলটি আকর্ষণীয় খেলার শৈলী, কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা এবং কঠোর পরিশ্রমের এক অনন্য সংমিশ্রণ।
চলতি আসরে আর্সেনালের খেলার ধরন বাস্তবমুখী এবং অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হওয়ার কারণে ফুটবল মহলে কিছুটা সমালোচিত হলেও তারা নিজেদের সফল কৌশল থেকে বিচ্যুত হয়নি। চলতি মৌসুমে ঘরোয়া ও ইউরোপীয় মঞ্চে আর্সেনালের রক্ষণভাগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ঈর্ষণীয় পরিসংখ্যান নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| পরিসংখ্যান ও রেকর্ডের ক্ষেত্র | অর্জিত সংখ্যা ও তথ্য |
| চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অপরাজিত ম্যাচের সংখ্যা | ১৪টি |
| চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হজম করা মোট গোল | মাত্র ৬টি |
| চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোল না খাওয়া ম্যাচের সংখ্যা | ৯টি (আসরের সর্বোচ্চ) |
| প্রিমিয়ার লিগে গোল না খাওয়া ম্যাচের সংখ্যা | ১৯টি |
| প্রিমিয়ার লিগে ১-০ ব্যবধানে জয়ের সংখ্যা | ৮টি |
উক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাবেক প্রধান কোচ جورج গ্রাহামের আমলের সেই বিখ্যাত স্লোগান ‘১-০ টু দ্য আর্সেনাল’ (১-০ ব্যবধানে আর্সেনালের জয়) এখন আবার সমর্থকেরা গর্বের সাথে মাঠে ফিরিয়ে এনেছেন। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি যখন তাদের নান্দনিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে দর্শকদের বিনোদন দিতে ব্যস্ত, তখন আর্সেনাল তাদের এই অভেদ্য রক্ষণাত্মক ফর্মুলা নিয়েই শনিবারের ফাইনালে মাঠে নামবে।
২০০৬ সালে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে যাওয়ার তিন বছর পর আর্সেনাল সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল। এর পরবর্তী সময়ে ইউরোপের এই অভিজাত প্রতিযোগিতায় তারা যেন কেবল সংখ্যা বাড়ানোর জন্যই অংশ নিচ্ছিল। টানা সাতবার শেষ ১৬ বা দ্বিতীয় পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর পরবর্তী পাঁচটি মৌসুমে তারা এই আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ২০১৯ সালে মিকেল আর্তেতা ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়ার পরও ইউরোপের এই মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে নিজেদের পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে দলটির বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল। তবে এরপর থেকে তাদের উন্নতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
দুই বছর আগে কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে সামান্য ব্যবধানে হেরে বিদায় নেওয়ার পর, গত মৌসুমে তারা সেমিফাইনালে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। তবে সেখানে লুইস এনরিকের পিএসজির কাছেই দুটি লেগের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে হেরে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। স্প্যানিশ কোচ আর্তেতা এক বছর আগের সেই তিক্ত পরাজয়ের পর গভীর ক্ষোভ ও প্রত্যয় প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, এই হার তাঁর দলকে ইউরোপ জয় করার জন্য আরও বেশি ক্ষুধার্ত করে তুলবে।
এই মহারণের কৌশলগত দিক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক আর্সেনাল মধ্যমাঠের খেলোয়াড় পল মার্সন জানিয়েছেন যে, এই ম্যাচে প্রথম গোলটিই হবে জয়ের মূল চাবিকাঠি। তাঁর মতে, পিএসজি দলটির প্রধান ভয় থাকবে আর্সেনালের বিরুদ্ধে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া নিয়ে। কারণ তারা ভালো করেই জানে যে, আর্সেনাল একবার এগিয়ে গেলে তাদের রক্ষণব্যূহ ভেদ করা কতটা কঠিন। ২০০৬ সালের বার্সেলোনা ম্যাচের মতো এবারও আর্সেনাল কিছুটা পিছিয়ে থেকে আন্ডারডগ হিসেবে ম্যাচ শুরু করলেও বড় মঞ্চে তাদের পারফর্ম করার ক্ষমতা নিয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ নেই। এখন আর্সেনালের সামনে সুযোগ এসেছে অতীতের সব ভুল শুধরে নিয়ে ইউরোপের নতুন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার।