খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুন ২০২৬, ২:৩৫ পিএম
কক্সবাজার আদালতের এক বিচারকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রহরীকে (গানম্যান) এক লাখ পিস ইয়াবাসহ আটকের পর সেই মাদক আত্মসাৎ ও অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় অবশেষে ফেঁসে গেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন। দীর্ঘ বিতর্ক, নানা প্রশ্ন এবং গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত বুধবার (১৭ জুন) রাত ৯টার দিকে তাকে কোতোয়ালি থানা থেকে প্রত্যাহার করে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক, প্রশাসন ও অর্থ) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী এই প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সরবরাহ করা অকাট্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেছে। সেই অনুযায়ী পুলিশ সদর দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ওসির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে বিপুল অংকের অনৈতিক লেনদেন ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে দায়মুক্তির যে ‘কোটি টাকার মিশন’ ওসি আফতাব শুরু করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর। চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানা-পুলিশ কক্সবাজার জেলা আদালতের বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে ১ লাখ পিস ইয়াবাসহ আটক করে। তবে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে তৎকালীন বাকলিয়া থানার ওসি আফতাব উদ্দিনের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ইয়াবাসহ ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং উদ্ধারকৃত সোয়া ২ কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবার চালানটি পুলিশ সদস্যরা নিজেরা আত্মসাৎ করেন।
ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ওসি আফতাব উদ্দিন বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নেন। গণমাধ্যমকর্মীরা তথ্য-প্রমাণসহ যোগাযোগ করলে তিনি তথ্য না দিয়ে নম্বর ব্লক করে দেন। এছাড়া নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের একটি কক্ষে নিয়ে পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করান যেন কেউ এই ঘটনা স্বীকার না করেন। পরবর্তীতে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হলে এবং ঘটনার শতভাগ তথ্য-উপাত্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে অভিযুক্ত কনস্টেবল ইমতিয়াজ দোষ স্বীকার করেন।
এই ইয়াবা কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদসহ মোট ১০ জন পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন দফায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বর্তমানে বরখাস্ত হওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে, যার তদন্ত করছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পশ্চিম) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী।
অভিযুক্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আসা পুলিশ সদস্যদের বিবরণ নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | নাম ও পদবি | তৎকালীন কর্মস্থল | বর্তমান অবস্থা / গৃহীত ব্যবস্থা |
| ১ | আফতাব উদ্দিন, পরিদর্শক (ওসি) | বাকলিয়া থানা (পরে কোতোয়ালি) | থানা থেকে প্রত্যাহার ও পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত |
| ২ | তানভীর আহমেদ, পরিদর্শক (তদন্ত) | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ৩ | মো. আল-আমিন সরকার, এসআই | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ৪ | মো. আমির হোসেন, এসআই | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ৫ | সাইফুল আলম, এএসআই | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ৬ | জিয়াউর রহমান, এএসআই | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ৭ | সাদ্দাম হোসেন, এএসআই | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ৮ | এনামুল হক, এএসআই | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ৯ | রাশেদুল হাসান, কনস্টেবল | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ১০ | উম্মে হাবিবা স্বপ্না, কনস্টেবল | বাকলিয়া থানা | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
| ১১ | ইমতিয়াজ হোসেন, কনস্টেবল (মূল অভিযুক্ত) | কক্সবাজার আদালত (গানম্যান) | সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় মামলা |
তদন্ত প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, কনস্টেবল ইমতিয়াজ কক্সবাজারের মো. মোশাররফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাসহ একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী ‘দেশ ট্রাভেলস’-এর একটি বাসে ওঠেন। এই কাজের বিনিময়ে তার ৮০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা ছিল। বাসটি শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও একজন পুলিশ সোর্স বাসে উঠে ঘুমন্ত ইমতিয়াজকে আটক করেন। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও তাকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বাসের চালক-সুপারভাইজারকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়।
পুলিশ বক্সে তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ এবং এসআই আল আমিন সরকারের উপস্থিতিতে লাগেজ খুলে ১০টি প্যাকেটে মোট ১ লাখ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। ইমতিয়াজ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে পুলিশ সদস্যরা মাদকগুলো নিজেদের হেফাজতে রেখে খালি লাগেজটি তাকে ফেরত দেন। এরপর ইমতিয়াজ অটোরিকশাযোগে কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করে পরিদর্শক আফতাব উদ্দিন দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন এবং ইয়াবা আত্মসাতের বিষয়ে কিছু জানেন না।
মহানগর পুলিশের তৈরি করা ৬ পৃষ্ঠার সুনির্দিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে ওসি আফতাব উদ্দিনকে সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে প্রধানত ৩টি গুরুতর আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ উল্লেখ করা হয়েছে:
১. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (৪৬ ধারা): আইন অনুযায়ী মাদক সংক্রান্ত অপরাধ আমলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ওসি কোনো আইনি ব্যবস্থা বা মামলা করেননি।
২. বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) ও পুলিশ আইন: কোনো ব্যক্তিকে মাদকসহ আটকের পর মামলা না করে তিনি পিআরবির ২৪৪ বিধি এবং পুলিশ আইনের ২৯ ধারা সরাসরি লঙ্ঘন করেছেন।
৩. প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা: ইয়াবা গায়েবের ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তিনি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণ করেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওসি আফতাব নিজেকে রক্ষা করতে রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী এবং দেশব্যাপী আলোচিত রকি বড়ুয়ার মাধ্যমে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছিলেন। এছাড়া সিএমপির সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তিনি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, যার কারণে পূর্ববর্তী সময়ে তাকে বাকলিয়া থেকে কোতোয়ালি থানায় বদলি করা হয়েছিল।
সাবেক সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ এ প্রসঙ্গে জানান, তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং পদ বহাল থাকা শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কক্সবাজারের পুলিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান (এসপি) এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, কনস্টেবল ইমতিয়াজকে বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা চালানো হচ্ছে।
সিএমপির বর্তমান পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, মাদক কারবারির ক্ষেত্রে পুলিশ ও সাধারণ জনগণের জন্য আইন সমান। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আসামাত্রই ওসি আফতাবসহ জড়িত সবার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনসহ সংশ্লিষ্ট প্রচলিত ফৌজদারি আইনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য