ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, তেহরান যদি দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে এবং সমঝোতার পথে না হাঁটে, তাহলে আগামী সপ্তাহে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের জন্য আগামী সপ্তাহটি অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। তাঁর ভাষায়, যদি তেহরান আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক আঘাত হানা হবে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে এমন অবকাঠামো, যা ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি তাদের জন্য সত্যিই খুব ভয়াবহ হতে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হবে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতুগুলো। তারা যদি আলোচনায় না বসে এবং সমঝোতায় না আসে, তাহলে আমরা তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু গুঁড়িয়ে দেব।”
এই মন্তব্য এমন এক সময় সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী টানা চতুর্থ দিনের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধও পুনর্বহালের কথা জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে যে সীমিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, সেটি কার্যত ভেঙে পড়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মনে করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির অবসান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকলে কূটনৈতিক সমাধানের পথও আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান সংঘাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে থাকে। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান কতদিন চলবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প তাঁর পরিচিত দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “আমি যতক্ষণ না বলছি যে ‘যথেষ্ট হয়েছে’, ততক্ষণ এই অভিযান চলবে।” তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বর্তমান সামরিক অভিযান নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত নেই।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এমন প্রকাশ্য ও কঠোর হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একদিকে সামরিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যদি উভয় পক্ষ দ্রুত সংলাপের পথে না ফেরে, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। তাই বর্তমান পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও গভীরভাবে পড়তে পারে।