খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত সংঘাত হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা, যেখানে সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে অনেক এগিয়ে থাকলেও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটা সরল নয়। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও ইরান এমন কৌশল নিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী। পাশাপাশি ইসরায়েলের মতো অভিজ্ঞ সামরিক মিত্র থাকায় শক্তির ভারসাম্য একপেশে বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর এটি আর সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন পরিণত হয়েছে কৌশলগত ধৈর্য ও দর-কষাকষির খেলায়।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সবচেয়ে কার্যকর চাল হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন যেখানে শতাধিক তেলবাহী জাহাজ চলাচল করত, বর্তমানে তা ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বেড়েছে।
নিচে যুদ্ধপূর্ব ও বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো—
| সূচক | যুদ্ধের আগে | বর্তমান পরিস্থিতি |
|---|---|---|
| দৈনিক তেলবাহী জাহাজ | ১০০+ | প্রায় ২০ |
| জ্বালানি সরবরাহ | স্থিতিশীল | ঝুঁকিপূর্ণ |
| বৈশ্বিক বাজার | তুলনামূলক স্থির | অস্থিরতা বৃদ্ধি |
| কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ | উন্মুক্ত পথ | ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি |
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও কম নয়। যদি ইরান কোনো মার্কিন বা মিত্র জাহাজে আঘাত হানতে সক্ষম হয়, তবে তা সামরিকভাবে ছোট হলেও প্রচারণাগতভাবে বড় বিজয়ে পরিণত হবে। একইভাবে স্থলসেনা মোতায়েন করলে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়বে, যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতিকে বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত একটি গভীর সংকটের আংশিক সমাধান মাত্র। বরং এটি প্রমাণ করে, শক্তিধর দেশ হয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ছোট কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য আলোচনার পথে যেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরান সরাসরি যুদ্ধে জয়ী হতে না পারলেও, দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে রাখার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ বাড়বে—এটাই তেহরানের মূল হিসাব।
তবে এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলো, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—সবই এর প্রভাবের আওতায় পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, এই যুদ্ধে কারও হাতে এককভাবে বিজয়ের নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি, আর ইরানের হাতে রয়েছে কৌশলগত চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা। উভয় পক্ষই যদি সতর্কভাবে পদক্ষেপ না নেয় এবং পরস্পরকে সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ না দেয়, তবে এই সংঘাত একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।