মঞ্চে ইসরাইলের পতাকা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছেন কলম্বিয়ার র্যাপার ও সংগীতশিল্পী চেলো হোপ। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং ইসরাইলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে তাঁর এই পদক্ষেপকে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ঘিরে তাঁকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনার পর একদিকে যেমন অনেকে তাঁর প্রতিবাদী অবস্থানের প্রশংসা করছেন, অন্যদিকে কূটনৈতিক পর্যায়েও দেখা গেছে প্রতিক্রিয়া।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ অক্টোবর কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটার সিমন বলিভার মেট্রোপলিটন পার্কে আয়োজিত ‘হিপ হোপ আল পারকে’ উৎসবে পারফর্ম করার সময় এ ঘটনা ঘটে। ভিডিওতে দেখা যায়, মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করছিলেন চেলো হোপ। একপর্যায়ে দর্শকদের মধ্য থেকে একজন মঞ্চে উঠে তাঁর দিকে ইসরাইলের পতাকা এগিয়ে দেন। পতাকাটি হাতে নেওয়ার পর সেটি মাটিতে ছুড়ে ফেলেন তিনি। এরপর পা দিয়ে মাড়িয়ে লাথি মেরে সরিয়ে দেন।
ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ওই সংগীতশিল্পীর পরিচয় জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জর্ডানের সংবাদমাধ্যম রয়া নিউজ ও ভারতের ফ্রি প্রেসের প্রতিবেদনে তাঁকে কলম্বিয়ান র্যাপার চেলো হোপ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে তাঁর নাম শিলো হোপ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক গান ও প্রতিবাদী অবস্থান
চেলো হোপ রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সামাজিক আন্দোলনকেন্দ্রিক গান পরিবেশনের জন্য পরিচিত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সংগীতে সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা বিষয় উঠে আসে। মঞ্চে সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি প্রকাশ্য আচরণের মাধ্যমেও শিল্পীরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে পারেন—চেলো হোপের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই আলোচনাকে সামনে এনেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সময় তিনি ‘অ্যানাতোমিয়া’ শিরোনামের একটি গান পরিবেশন করছিলেন। সেই পরিবেশনার একপর্যায়ে পতাকা মাড়ানোর ঘটনাটি ঘটে। এ ছাড়া তাঁকে ‘পালেস্তিনা লিব্রে’ স্লোগান দিতেও শোনা যায়। স্প্যানিশ ভাষার এই স্লোগানের অর্থ ‘মুক্ত হোক ফিলিস্তিন’।
চেলো হোপের এই পদক্ষেপকে তাঁর সমর্থকেরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের প্রেক্ষাপটে এমন প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতির প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা ও সমালোচনা
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেক ব্যবহারকারী চেলো হোপের প্রতিবাদী আচরণের প্রশংসা করেছেন। তাঁদের কাছে এটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন এবং ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
তবে এমন আচরণ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। পতাকাকে জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে কোনো দেশের পতাকা মাটিতে ফেলে মাড়ানোর ঘটনাকে কেউ রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে দেখলেও অন্যরা অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। চেলো হোপের ঘটনাটি নিয়েও এমন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কলম্বিয়ায় নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত নিন্দা জানিয়েছেন। ফলে একটি সংগীত উৎসবের মঞ্চে ঘটে যাওয়া ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা ছাড়িয়ে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সংগীতের মঞ্চে রাজনৈতিক বার্তা
রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা দীর্ঘদিন ধরে গান, কনসার্ট ও প্রকাশ্য বক্তব্যকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। বিশেষ করে হিপহপ সংগীতে বৈষম্য, অধিকার, সংঘাত ও সামাজিক আন্দোলনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। অনেক শিল্পী গানের কথা কিংবা মঞ্চে প্রতীকী আচরণের মাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
চেলো হোপের ঘটনাটিও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আলোচিত হচ্ছে। তাঁর সমর্থকেরা পদক্ষেপটিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, পতাকার প্রতি আচরণ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক দেখিয়ে দিচ্ছে, রাজনৈতিক বার্তা প্রকাশের ধরন নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।
ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাত এবং গাজায় চলমান মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। এ নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ, সংহতি প্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রতিবাদ দেখা গেছে। শিল্পীদের বক্তব্য ও মঞ্চের পরিবেশনাও কখনো কখনো সেই বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে।
বোগোটার ‘হিপ হোপ আল পারকে’ উৎসবে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি চেলো হোপকে আরও বিস্তৃত দর্শকের কাছে পরিচিত করেছে। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি, রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা এবং জাতীয় পতাকার মর্যাদা—এই বিষয়গুলোকে ঘিরেই তাঁর পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।


