খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ১০:১৬ এএম
বাংলা কবিতার আকাশে কিছু নক্ষত্র থাকে, যাদের আলো নিভে গেলেও অন্ধকার নামে না; বরং তাঁদের সৃষ্টির দীপ্তি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পথ দেখায়। কবি শামসুর রাহমান তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান নির্মাতা, নাগরিক জীবনের কবি, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের কবি, অসাম্প্রদায়িক মানবিকতার এক নির্ভীক কণ্ঠ।
১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীর ৪৬ নম্বর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শামসুর রাহমান। পিতা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মাতা আমেনা খাতুন। পুরান ঢাকার অলিগলি, মানুষের জীবন, আনন্দ-বেদনা, উৎসব-উন্মাদনা এবং নাগরিক বাস্তবতার যে গভীর ছাপ তাঁর মনে শৈশবেই গেঁথে গিয়েছিল, পরবর্তীকালে তা তাঁর কবিতা ও গদ্যে নানাভাবে ফিরে এসেছে।
মাত্র আঠারো বছর বয়সে শুরু হয় তাঁর কবিতা লেখা। ১৯৪৩ সালে ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত নতুন কবিতা সংকলনে তাঁর কবিতা তাঁকে তরুণ কবি হিসেবে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর ১৯৬০ সালে প্রকাশিত প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কবিতার অঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র আসন সুদৃঢ় করেন।
জীবনানন্দ দাশ-পরবর্তী বাংলা কবিতার আধুনিকতার যে প্রবাহ, শামসুর রাহমান ছিলেন তার অন্যতম প্রধান ও শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতায় একই সঙ্গে উপস্থিত হয়েছে নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা, প্রেম, প্রকৃতি, ব্যক্তিমানুষের স্বপ্ন ও সংকট; পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে স্বদেশ, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
কবিতা তাঁর কাছে শুধু সৌন্দর্যের অন্বেষণ ছিল না—কবিতা হয়ে উঠেছিল সময়ের কাছে দায়বদ্ধতার ভাষা।
১৯৬৭ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তার প্রতিবাদে তিনি মুনীর চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রকাশিত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সরাসরি যুক্ত হন। জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি হিসেবে কবিতাকে তিনি পরিণত করেছিলেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের শক্তিতে। ১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের রোষের মুখে দৈনিক বাংলার সম্পাদক পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকতা জীবনেরও অবসান ঘটান।
আর ১৯৭১—বাঙালির ইতিহাসের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে শামসুর রাহমানের কবিতা হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়ের ভাষা। তাঁর অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন কবিতাগুচ্ছ বন্দী শিবির থেকে আজও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য কাব্যিক দলিল। বন্দী শিবির থেকে–এর কবিতায় যেমন ছিল বন্দিত্বের যন্ত্রণা, তেমনি ছিল মুক্তির স্বপ্ন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রত্যয়।
স্বাধীনতার পরও তিনি থেমে থাকেননি। সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচার, অন্যায় ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল সদা সোচ্চার। তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি রাজনীতিকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তাকে রূপ দিয়েছেন মানবিক অনুভূতি, প্রতীক, চিত্রকল্প ও শিল্পের গভীরতায়।
‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’—শিরোনামটিই যেন তাঁর সময়কে দেখার এক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক আয়না। স্বদেশের অসংগতি, রাষ্ট্রের বিচ্যুতি, মানুষের হতাশা ও সময়ের অদ্ভুত বৈপরীত্য তাঁর কবিতায় কখনো বিষণ্নতা, কখনো বিদ্রূপ, আবার কখনো প্রতিবাদের আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছে।
শামসুর রাহমান শুধু কবি ছিলেন না—তিনি ছিলেন সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, অনুবাদক, ছড়াকার ও স্মৃতিচারণকারী। রৌদ্র করোটিতে, বন্দী শিবির থেকে, দুঃখের আরেক নাম, নিরালোকে দিব্যরথ, বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশসহ অসংখ্য কাব্যগ্রন্থে তিনি সময় ও সমাজের নানা মুখ এঁকেছেন। শেক্সপিয়রের হ্যামলেট, রবার্ট ফ্রস্টসহ বিদেশি কবি-সাহিত্যিকদের রচনাও অনুবাদ করেছেন। তাঁর স্মৃতির শহর পুরান ঢাকার জীবন ও স্মৃতির এক অনন্য দলিল।
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি অর্জন করেছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার, জীবনানন্দ পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা। ১৯৯৪ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৯৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে।
প্রায় সাত দশকের সৃষ্টিশীল জীবনে শামসুর রাহমান বাংলা কবিতাকে শুধু সমৃদ্ধই করেননি, তাকে যুক্ত করেছেন বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের জীবন, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ইতিহাসের সঙ্গে। তাঁর কবিতায় প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে প্রতিবাদ; নিঃসঙ্গতা যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা; ব্যক্তিমানুষ যেমন আছে, তেমনি আছে সমগ্র স্বদেশ।
২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট তাঁর জীবনাবসানের কথা সাধারণত স্মরণ করা হলেও বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন ১৮ আগস্ট ২০০৬।
আজ তাঁর প্রয়াণের দুই দশক পরও শামসুর রাহমান আমাদের কাছে কেবল একজন প্রয়াত কবি নন—তিনি আমাদের সময়ের বিবেক, স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর, নাগরিক জীবনের সংবেদনশীল ভাষ্যকার।
তাঁর কবিতার শব্দে আজও জেগে ওঠে বাংলাদেশ।
আজও তাঁর উচ্চারণে আমরা শুনি স্বাধীনতার পদধ্বনি।
আজও তাঁর প্রতিবাদে সাহস পায় বিবেক।
আর আজও তাঁর কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
স্বদেশকে ভালোবাসা মানে শুধু তার সৌন্দর্যকে ভালোবাসা নয়; তার অন্ধকারের বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো।
বাংলা কবিতার এই দীপ্তিমান কবির প্রতি
গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।
মন্তব্য