খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই আগস্ট ২০২৬, ৯:৪৭ এএম
“এই রূপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে বহুদূরে,
সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে।
মনে রেখো তুমি কত রাত, কত দিন—
শুনিয়েছি গান আমি…”»
কখনো কখনো কিছু শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ, সুর আর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তাঁরা থেকে যান মানুষের হৃদয়ে। আইয়ুব বাচ্চু তেমনই একজন শিল্পী—বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর রূপালি গিটারের ঝংকার কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে আজও অনুরণিত।
জন্ম: ১৬ আগস্ট ১৯৬২
মৃত্যু: ১৮ অক্টোবর ২০১৮
চট্টগ্রামের সংগীতময় পরিবেশে বেড়ে ওঠা আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবনের সূচনা কৈশোরেই। গিটার হাতে তাঁর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা একসময় তাঁকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পীতে পরিণত করে। তাঁর কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা, গিটারের অসাধারণ ব্যবহার, মঞ্চে প্রাণবন্ত পরিবেশনা এবং সুর সৃষ্টির অনন্য ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে ‘সোলস’ ও পরবর্তীকালে ‘এলআরবি’-র সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। সোলসে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর ১৯৯১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’ (LRB)। পরবর্তীতে এই ব্যান্ডের নামই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের এক স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড।
আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে গায়ক, গিটারবাদক, সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক। ব্যান্ড সঙ্গীতকে তিনি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; তাঁর সৃষ্টিতে প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, জীবনসংগ্রাম ও নাগরিক মানুষের আবেগ পেয়েছে গভীর শিল্পরূপ।
‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘রুপালি গিটার’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’—এমন অসংখ্য গান তাঁর কণ্ঠ ও সুরে হয়ে উঠেছে শ্রোতাদের ভালোবাসার সম্পদ।
তাঁর গিটারের জাদু ছিল আলাদা। বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতে ইলেকট্রিক গিটারকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে আইয়ুব বাচ্চুর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর দীর্ঘ গিটার সোলো, মঞ্চের দাপুটে পরিবেশনা এবং কণ্ঠের আবেগ তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে করে তুলেছিল এক অনন্য আইকন।
শুধু ব্যান্ডের গান নয়, চলচ্চিত্রের গানেও তিনি রেখেছেন অসামান্য স্বাক্ষর। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া অনেক গান চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। সংগীতের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং নিরলস সাধনা তাঁকে পরিণত করেছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতের এক অনিবার্য অধ্যায়ে।
আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের শেষ দিকেও থেমে থাকেনি তাঁর সংগীতযাত্রা। ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর রংপুর জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত কনসার্টে তিনি শেষবারের মতো মঞ্চে গান পরিবেশন করেন। কে জানত, প্রিয় শিল্পীর হাতে ধরা সেই গিটারই অল্প কয়েক দিনের মধ্যে হয়ে উঠবে তাঁর শেষ মঞ্চস্মৃতি!
মাত্র দুই দিন পর, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে যায় দেশের সংগীতাঙ্গন। অগণিত ভক্তের হৃদয়ে নেমে আসে গভীর শোক।
অদ্ভুত এক বেদনার সত্য—যে শিল্পী নিজেই গেয়েছিলেন,
“এই রূপালি গিটার ফেলে একদিন
চলে যাব দূরে বহুদূরে…”
একদিন সত্যিই তিনি তাঁর প্রিয় রূপালি গিটারটি রেখে চলে গেলেন—দূর বহুদূরে। কিন্তু তাঁর গান রেখে গেলেন আমাদের জন্য। রেখে গেলেন তাঁর গিটারের ঝংকার, তাঁর কণ্ঠের মাদকতা, তাঁর সুরের মায়া এবং অসংখ্য স্মৃতি।
আইয়ুব বাচ্চু নেই—
কিন্তু তাঁর গান আছে।
তিনি নেই—
কিন্তু কোনো এক নির্জন রাতে হঠাৎ যখন বাজে ‘সেই তুমি’,
যখন হৃদয়ের গোপন কষ্টে কেউ গুনগুন করে ‘চলো বদলে যাই’,
যখন কোনো তরুণের হাতে উঠে আসে একটি গিটার—
তখন মনে হয়,
আইয়ুব বাচ্চু আসলে কোথাও যাননি।
তিনি আছেন তাঁর সৃষ্টিতে,
আছেন আমাদের ভালোবাসায়,
আছেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে।
রূপালি গিটারের সেই জাদুকরকে আজ তাঁর জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, আইয়ুব বাচ্চু।
আপনার গিটারের তারে বাঁধা সুর বেঁচে থাকুক অনন্তকাল।
মন্তব্য