খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫
এক সময় ঢাকার বিকেল মানেই ছিল বৃষ্টিভেজা কাদামাটির গন্ধ, গাছের ভেজা পাতায় শীতল বাতাসে প্রকৃতির সজীবতা। কিন্তু সময় বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচিত গন্ধ, সেই প্রাণবন্ত প্রকৃতিও যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে নগরের ভিড়ে। আর এরই সঙ্গে হারিয়ে গেছে এক প্রাকৃতিক বন্ধু—উপকারী মশা ‘টক্সোরিঙ্কাইটিস’, যাকে বলা হতো ‘হাতি মশা’।
এই মশার বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যতিক্রম। এরা রক্ত চুষে খেত না, বরং ফুলের পরাগায়ণ ঘটাত এবং জলাশয়ের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও মশার লার্ভা খেয়ে পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষা করত। কিন্তু এখন ঢাকা শহরের জলাশয়ে এই মশা প্রায় বিলুপ্ত। এর জায়গা নিয়েছে প্রাণঘাতী এডিস মশা, যা রক্ত শোষণ করে ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক রোগ ছড়াচ্ছে।
রাজধানীর হাতিরঝিলে বসবাসরত ৩৪ বছর বয়সী মারুফ ইসলাম বলেন,
“শৈশবে গ্রামের বাড়িতে পুকুরে বড়সড় লার্ভা দেখতাম, যেগুলো আমরা হাতি মশা বলতাম। এখন ঢাকায় শুধু দেখি ছোট ছোট কালো মশা, যেগুলোর কামড়েই মাথা ঘুরে যায়।” মারুফ সম্প্রতি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
ঢাকা শহরের বেশিরভাগ জায়গাতেই এখন দিন-রাত সমানভাবে মশার উপদ্রব। শহরের জলাশয়গুলোতে আগের মতো উপকারী মশার অস্তিত্ব নেই, যার ফলে প্রাকৃতিকভাবে মশার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও নষ্ট হয়ে গেছে।
প্রাকৃতিক মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জানান, টক্সোরিঙ্কাইটিস মশা দেখতে সাধারণ মশার তুলনায় বড় ও রঙিন হয় এবং এরা মানুষের রক্ত খায় না। পরিণত অবস্থায় তারা ফুলের মধু, ফলের রস, বা গাছের রস খায়—যার ফলে পরাগায়ণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক হয়।
তাদের শূককীট বা লার্ভা পর্যায়ে এরা ডেঙ্গুবাহি এডিস ও ম্যালেরিয়াবাহি অ্যানোফিলিস মশার লার্ভা খেয়ে ফেলে। একারণেই এদের ‘প্রাকৃতিক কীটনাশক’ বলা হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও শহরের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের ফলে এই উপকারী মশাগুলো শহর থেকে বিলুপ্তপ্রায়।
মশা মানেই এখন ঢাকায় মৃত্যু
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে ঢাকায় প্রাণ হারিয়েছেন ১১৬৩ জন। আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৭ লাখে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩% বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, জুলাই মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেই নতুন আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ১৬ হাজার।
ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ জন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। ডাক্তারদের মতে, আইসিইউ শয্যা সংকট, প্লাটিলেট ঘাটতি, এবং শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে।
একটি গবেষণায় (Clinical Profile of Dengue Patients, ২০২৪) দেখা গেছে, ১০৭ জন রোগীর মধ্যে প্রায় ২৬% রোগীর প্লাটিলেট ট্রান্সফিউশন এবং ১১% রোগীকে আইসিইউতে নিতে হয়েছে। আক্রান্তদের অর্ধেকই ঢাকার বাসিন্দা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, উষ্ণতা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির ফলে মশার প্রজননক্ষেত্র বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়েই উপকারী মশার সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং বাড়ছে ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস।
ঢাকা এখন মশার স্বর্গরাজ্য
রাজধানীর খিলগাঁও, মুগদা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, ধানমণ্ডি—সব এলাকা থেকেই প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, উন্মুক্ত নালা ও জলাবদ্ধতা মশার আদর্শ বাসস্থান তৈরি করেছে। নিয়মিত ফগিং বা স্প্রে করলেও তাতে ডেঙ্গু সংক্রমণ থামছে না।
২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৭৪% এডিস মশার লার্ভা প্লাস্টিক ও অন্যান্য কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। এমনকি এখন দিন ও রাত উভয় সময়েই এরা কামড়ায়, যা আগের চেয়ে ভয়াবহ।
হারানো সৈনিকদের ফিরিয়ে আনার সময় এখন
পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আহমদ কামরুজ্জমান বলেন, “এই শহরে একটি মশার কামড়ই এখন হাসপাতালে নেয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সামান্য অবহেলায় পুরো পরিবারে নেমে আসছে শোক।”
তিনি বলেন, “আমরা এক সময় প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই মশা নিয়ন্ত্রণ করতাম। হাতি মশার মতো উপকারী মশাগুলো ছিল আমাদের প্রথম প্রহরী। তাদের বিলুপ্ত করে নিজেদেরই অসহায় করে তুলেছি।”
অন্যদিকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা উপকারী মশার কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র তৈরির কাজ করছেন, যা সফল হলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
এই প্রজাতির মশা বড় আকৃতির ও উজ্জ্বল রঙের হওয়ায় অনেকে আতঙ্কিত হন, কিন্তু এটি মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উপকারী। দেখা গেলে মেরে না ফেলে সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।
শেষ কথা
ঢাকার মানুষ আজ যানজট আর দূষণ ছাড়াও মশার ভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। অথচ একসময় প্রকৃতি নিজেই আমাদের সুরক্ষা দিত। এখন সময় সেই প্রকৃতিকেই রক্ষা করার, পরিবেশবান্ধব সমাধানে মনোনিবেশ করার। কারণ প্রকৃতিই ছিল আমাদের প্রথম ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষাব্যুহ।
খবরওয়ালা/টিএসএন