খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর ২০২৫
ঋণের বোঝা যেন পাহাড় হয়ে নেমেছিল রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বনকিশোর গ্রামের মিঠুন দাসের (২৮) জীবনে। সিসি ক্যামেরা বসানোর ছোট ব্যবসা আর ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির চাকরিই ছিল তার ভরসা। কিন্তু উপার্জনের প্রায় সবটাই চলে যেত ঋণের সুদ পরিশোধে। দিন দিন দমবন্ধ হয়ে আসছিল তার জীবন।
দুঃসময় শুরু হয় গত ডিসেম্বর থেকে। আগাম টাকা নিয়ে সিসি ক্যামেরা বসানোর অর্ডার করেছিলেন মিঠুন। সেই টাকা দিয়ে এক বন্ধুকে ক্যামেরা কিনতে দিয়েছিলেন। কিন্তু বন্ধু টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়। পরে ঋণ করে ক্যামেরা কিনে ইনস্টল করলেও বিদ্যুতের ভুল সংযোগে সব ক্যামেরা পুড়ে যায়। কোম্পানি চাপায় ২ লাখ টাকার জরিমানা। এভাবেই সাড়ে ৩ লাখ টাকার ঋণে ডুবে যান তিনি।
এরপর একে একে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেন। এমনকি মা রানী দাস গয়নাও বন্ধক রেখে তুলেছিলেন ৫০ হাজার টাকা। প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা কেবল সুদ শোধে যেত। এর মধ্যে ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি নেন মিঠুন। কিন্তু বাসে যাতায়াতের পথে কোম্পানির প্রায় ৩ লাখ টাকা চুরি হয়ে গেলে ভেঙে পড়েন পুরোপুরি।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ফেসবুকে লাইভে এসে চোখ ভেজা কণ্ঠে নিজের দুঃখের কাহিনী শোনান মিঠুন। বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে একের পর এক বিপদ ঘিরে ধরেছে আমাকে। কোম্পানির ৩ লাখ টাকা হারিয়ে ফেলেছি, অথচ কেউ বিশ্বাস করবে না।’ শেষ মুহূর্তে ক্ষমা চান সবার কাছে। সরকারের প্রতি আবেদন রেখে যান—‘আমার পরিবারটাকে ঋণমুক্ত কইরেন, শেষ হতে দিয়েন না।’ তারপর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে জীবন শেষ করেন তিনি।
সেই দিন দুপুরে মাকে ফোন করেছিলেন মিঠুন। জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মা, ভালো আছো?’ মা রানী বলেছিলেন, ‘ভালো আছি, তুই কোথায়?’—কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎ ফোন কেটে দেন তিনি। রাতে আর কোনো সাড়া মেলেনি। পরে সীতাকুণ্ড থেকে খবর আসে, ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়েছেন মিঠুন। রাতেই তার মরদেহ পৌঁছায় বাড়িতে এবং পাশের বড়াল নদের তীরে দাহ সম্পন্ন হয়।
মাত্র ১৪ মাস আগে নাটোরের মেয়ে বিউটি দাসকে বিয়ে করেছিলেন মিঠুন। সংসারের স্বপ্ন শুরু হলেও তার আগেই ভেঙে গেল সবকিছু। এখন নির্বাক স্ত্রী শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। সংক্ষেপে বলেন, ‘সেদিন সে আমাকে ফোন করেছিল। বলেছিল কাজে আছি, পরে কথা বলব। কিন্তু আর কোনো কথা হলো না।’
অসুস্থ বাবা প্রেমানন্দ দাস বিছানায় শয্যাশায়ী, সংসারে একমাত্র ভরসা ছিলেন মিঠুন। ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন মা রানী। বুকভাঙা কান্নায় বললেন, ‘আমার তো আর কোনো ছেইলে নাই। ওর বাপ আগে ভ্যান চালাত, এখন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। মাথার ওপর এত ঋণ। আমার বাকি দিনটা চালাইব কে?’
ঋণের বোঝা, বিশ্বাসঘাতক বন্ধু, কোম্পানির জরিমানা আর চুরি হওয়া টাকা—সব মিলিয়ে আর সহ্য করতে পারেননি মিঠুন দাস। রেখে গেলেন মায়ের অন্তহীন শোক, স্ত্রীর নিঃশব্দ কষ্ট আর এক অসহায় পরিবারের দুঃসহ ঋণের বোঝা।
খবরওয়ালা/এমএজেড