চিত্রকর্মটি উদ্ধারের সূত্র পাওয়া যায় ২০২৪ সালে ইতালির পারমা শহরে আয়োজিত একটি প্রত্নবস্তু প্রদর্শনীর ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। প্রদর্শনী থেকে সংগ্রহ করা ছবিগুলো এআই-চালিত তথ্যভান্ডারে যুক্ত করার পর একটি সন্দেহজনক চিত্রকর্ম শনাক্ত হয়। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, হাতে একটি পুরোনো চিঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণী। প্রথম দেখায় এটিকে সাধারণ একটি প্রতিকৃতি মনে হলেও এআইয়ের বিশ্লেষণে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য।
প্রযুক্তিটি চিত্রকর্মটির সঙ্গে ১৭ শতকের সেন্ট অগনেসের একটি শিল্পকর্মের মিল খুঁজে পায়। তদন্তে জানা যায়, চিত্রকর্মটি ২০০৪ সালে ইতালির পপোলি শহরের একটি গির্জা থেকে চুরি হয়েছিল। চুরির পরিচয় আড়াল করতে মূল চিত্রকর্মের চরিত্র ও নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল বলে জানা যায়। ফলে ধর্মীয় চরিত্রের ছবিটি সাধারণ এক তরুণীর প্রতিকৃতি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল। এআইয়ের বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া সূত্রের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত চুরি যাওয়া শিল্পকর্মটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালভাতোরে রাপিকাভোলি জানান, সোয়াডস (SWOADS) নামের এআই অ্যালগরিদম ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে কাজ শুরু করার পর উল্লেখযোগ্য ফল দিয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির সহায়তায় এখন পর্যন্ত ৩০৩টি চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য এবং ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি মুদ্রা ও প্রাচীন নথি উদ্ধারে সহায়তা পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা এসব নিদর্শনের আনুমানিক মূল্য ২০ কোটি ইউরোর বেশি।
প্রযুক্তিটি কীভাবে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, চিত্রকর্মের রঙের অনুপাত, নকশা, রেখার বিন্যাস এবং ক্যানভাসের অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এআই একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচিতি তৈরি করতে পারে। পরে সেই বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যভান্ডারে থাকা শিল্পকর্মের মিল খোঁজা হয়। মূল চিত্রকর্মে পরিবর্তন আনা হলেও কিছু সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য অক্ষত থাকতে পারে। সেগুলো শনাক্ত করেই সন্দেহজনক শিল্পকর্ম সম্পর্কে নতুন সূত্র পাওয়া সম্ভব হয়।
শিল্পকর্ম চুরি হওয়ার পর অপরাধীরা অনেক সময় সেগুলোর পরিচয় গোপন করতে নাম, নকশা কিংবা দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে। কিছু ক্ষেত্রে চুরি হওয়া নিদর্শন ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা হয়, আবার কখনো সেগুলো অবৈধ বাজারে বিক্রির চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের অপরাধে শিল্পকর্মের আসল পরিচয় নির্ধারণ করা এবং সেটির মালিকানা প্রমাণ করা তদন্তকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এআইয়ের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ছবি ও নথি দ্রুত তুলনা করা গেলে অনুসন্ধানের সময় কমানো সম্ভব।
তবে প্রযুক্তিটি সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। আর্ট রিকগনিশন প্রতিষ্ঠানের সহপ্রতিষ্ঠাতা কারিনা পপোভিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের আর্ট ক্রাইম টিমের সাবেক প্রধান টিমোথি কার্পেন্টারের মতে, এআই মূলত তদন্তের জন্য সম্ভাব্য সূত্র শনাক্ত করে দেয়। সেই সূত্রের সত্যতা যাচাই, অপরাধী শনাক্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব মানুষেরই।
তথ্যভান্ডারে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য থাকলে বিশ্লেষণের ফলও প্রভাবিত হতে পারে। একইভাবে, কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি কিংবা মূল শিল্পকর্মের নিখুঁত অনুলিপির ক্ষেত্রে প্রকৃত নিদর্শন শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই এআইয়ের দেওয়া ফলাফলকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে না ধরে বিশেষজ্ঞের পরীক্ষা ও প্রচলিত তদন্তপ্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
ইতালির পাশাপাশি ফ্রান্স, জার্মানি ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের আইডি-আর্ট ব্যবস্থাও চুরি যাওয়া শিল্পকর্ম শনাক্ত ও নথিভুক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সুযোগ বাড়ছে।
প্রাচীন চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, মুদ্রা ও ধর্মীয় নিদর্শন শুধু আর্থিক সম্পদ নয়; এগুলো ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একবার হারিয়ে গেলে অনেক নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণে এআইয়ের সহায়তায় চুরি যাওয়া শিল্পকর্মের পরিচয় পুনরুদ্ধার এবং সেগুলোকে বৈধ মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার, দক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতার ওপর।


