পুলিশে চেইন অব কমান্ড ভাঙার আশঙ্কা, পদোন্নতির প্রস্তাবে বিতর্ক’ শিরোনামে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার করার অপরাধে স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিমকে হঠাৎ স্ট্যান্ড রিলিজ করে দুর্গম অঞ্চলে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে দীর্ঘ দিন বঞ্চিত হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার নেপথ্যে পুলিশ সদরদপ্তরের এক প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (২৪ আগস্ট) এক আদেশে মো. রেজাউল করিমকে স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে খাগড়াছড়ির এপিবিএন ও বিশেষায়িত ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়। এই আদেশের পরপরই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি চরম আবেগঘন এবং ক্ষুব্ধ পোস্ট দেন এই পুলিশ সুপার, যা মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশের অভ্যন্তরীণ সার্কেল এবং সাধারণ নেটিজেনদের মাঝে তোলপাড় সৃষ্টি করে।
ফেসবুক পোস্টে নিজের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে মো. রেজাউল করিম লেখেন, ‘আমি সংযুক্ত: আমার কাজ আর বাংলাদেশ পুলিশের প্রয়োজন নেই। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে কেন ভালো কাজ করতে অফিসাররা উৎসাহিত হন না, তার আরেকটা উদাহরণ তৈরি হলো আমার পোস্টিং দিয়ে। আলহামদুলিল্লাহ, বিগত ১৫ বছরের চাকরিতে ৯ বছর ছিলাম ডাম্পিং পোস্টিংয়ে, কিছুই মনে করিনি, এখনো মনে করব না। শুধু এটুকুই বলব, এই ডিপার্টমেন্ট তেলবাজদের জন্যই ফিট। আমার মতো উচিত কথা বলা, সাহস নিয়ে সত্য বলা, নিয়ম মেনে কাজ করা অফিসারের কদর এই ডিপার্টমেন্ট করতে পারবে না। ১০০% সততা, স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করেও যদি এই রেজাল্ট পেতে হয়, তাহলে আর আমার কিচ্ছু বলার নাই। এই ডিপার্টমেন্ট আমার জন্য নয়।’
চাকরি জীবনের চরম অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, ‘অন্যায়কে মেনে নেওয়ার চেয়ে সংযুক্ত থাকাই শ্রেয়। আমার আর বোধ হয় চাকরি করা হলো না। ভালো থাকবেন সবাই।’
বদলি বা সংযুক্তির আসল কারণ ব্যাখ্যা করে ওই পোস্টের বিশেষ দ্রষ্টব্যে তিনি স্পষ্টভাবে যুক্ত করেন যে, কয়েক দিন আগে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন সংক্রান্ত ‘পুলিশে চেইন অব কমান্ড ভাঙার আশঙ্কা, পদোন্নতির প্রস্তাবে বিতর্ক’ শিরোনামের একটি সংবাদের লিঙ্ক তিনি নিজের ওয়ালে শেয়ার করেছিলেন। বিষয়টি নজরে আসার পর পুলিশ সদরদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাঁকে ডেকে বকাঝকা করেন এবং কৈফিয়ত তলব করেন। পরবর্তীতে তিনি সেই পোস্টটি মুছে ফেললেও শেষ রক্ষা হয়নি; খড়্গ নেমে আসে তাঁর ওপর।
সংবাদমাধ্যমের কাছে ঘটনাটির বিস্তারিত তুলে ধরে পুলিশ সুপার রেজাউল করিম অভিযোগ করেন, সম্প্রতি অতিরিক্ত আইজি পদে পদোন্নতি পাওয়া পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি (কনফিডেনশিয়াল) মো. কামরুল আহসান তাঁকে খবর শেয়ার করার বিষয় নিয়ে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করেন এবং এই শাস্তিমূলক বদলির ব্যবস্থা করেন। তবে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুল আহসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, বরং তাঁর দপ্তরে গিয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন।
কর্মজীবন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৯তম বিসিএস ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ২০১১ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। সারদার মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল মুক্তাগাছা এপিবিএন-এ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদায়নের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হন তিনি। চাকরি জীবনের প্রায় ১৫ বছরের মধ্যে ৯ বছরই তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশ, এপিবিএন, এভসেক ও ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের মতো অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বা ‘ডাম্পিং’ পদে আটকে রাখা হয়েছিল।
তবে রাজবাড়ী জেলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে টানা দুই বছর কাজ করার সময় তিনি সাধারণ জনগণের ব্যাপক আস্থা অর্জন করেন। এছাড়া কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশে কর্মরত থাকাকালে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেওয়া তাঁর সাহসী পদক্ষেপ এবং হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধার করে মূল মালিকের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলো সারা দেশে পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিল। সর্বশেষ তিনি সিটি এসবিতে অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কাজের যথাযথ স্বীকৃতি না পেয়ে উল্টো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রোষানলে পড়ে বদলি হওয়ার ঘটনাটি পুলিশ বাহিনীর ভেতরের অসন্তোষকেই আবার সামনে এনে দিল।


