এশিয়ান গেমসে নারী ক্রিকেটের হতাশা, সংকট মাঠের বাইরেও

এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অভিযান শেষ হয়েছে ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ে পাকিস্তানের কাছে ৩১ রানে হেরে। ২০২৩ সালে চীনের হাংজু এশিয়ান গেমসে জেতা পদক এবার ধরে রাখতে পারেনি দলটি। তবে এবারের ব্যর্থতাকে কেবল ব্যাটিং-বোলিংয়ের দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে রাজি নন বাংলাদেশ নারী দলের কোচ সারোয়ার ইমরান। তাঁর মতে, মাঠের বাইরের অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাও দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে।

জাপানের নিশিনের কোরোগি স্পোর্টস পার্কে সোমবার অনুষ্ঠিত ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে পাকিস্তানের দেওয়া ১৪৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৭ উইকেটে ১১৪ রানেই থামে বাংলাদেশের ইনিংস। এর আগে ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ১১৪ রানের বড় ব্যবধানে হেরেছিল দল। ফলে টুর্নামেন্টের শেষ দুই ম্যাচেই বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে বড় হতাশা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের এবারের এশিয়ান গেমস অভিযান অবশ্য শুরু থেকেই কিছুটা ভিন্ন ছিল। চীনের বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় মাঠে বল গড়ায়নি। সেই ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সেমিফাইনালে ওঠে। সেখানে ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিংয়ের সামনে দাঁড়াতে পারেনি দলটি। এরপর পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও ব্যাটিং ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুটাই বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। ১৪৫ রানের লক্ষ্য টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অসম্ভব কোনো স্কোর নয়। কিন্তু পাওয়ারপ্লেতে প্রত্যাশিত রান তুলতে না পারায় শুরুতেই চাপে পড়ে বাংলাদেশ। কোচ সারোয়ার ইমরানের হিসাবে, প্রথম ছয় ওভারে অন্তত ৪০ থেকে ৪৫ রান তুলতে পারলে ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাখা সম্ভব হতো। সেখানে বাংলাদেশ করতে পারে মাত্র ২৪ রান।

প্রথম ১০ ওভার শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩ উইকেটে ৪৩ রান। ফলে শেষ ১০ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন দাঁড়ায় ১০৩ রান। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি উইকেট ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত গতি আর ফিরে পায়নি বাংলাদেশের ইনিংস।

ব্যাটিংয়ের এই দুর্বলতা অবশ্য নতুন নয় বলে মনে করেন সারোয়ার ইমরান। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাস দুয়েক আগে এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জেতার মতো অবস্থান থেকে ম্যাচ হাতছাড়া করার পর থেকেই দলের ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও ১২০-১৩০ রানের আশপাশে আটকে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। সেই সমস্যাই এশিয়ান গেমস পর্যন্ত বয়ে এসেছে বলে মনে করেন তিনি।

শুধু রান তোলার হার নয়, দলের বড় শট খেলার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কোচ। টি-টোয়েন্টিতে মাঝের ও শেষের ওভারে দ্রুত রান তোলার জন্য বাউন্ডারি ও ছক্কার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে সেই আক্রমণাত্মক মানসিকতা এবং কার্যকর শটের ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না বলে তাঁর বক্তব্য।

তবে কোচের হতাশার জায়গা শুধু মাঠের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। দলের ভেতরে এবং বাইরে তৈরি হওয়া চাপ নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। বিশেষ করে হেড কোচ ও অধিনায়ককে ঘিরে চলমান সমালোচনা দলের স্বাভাবিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এশিয়ান গেমস শুরুর আগে টি-টোয়েন্টি দলের নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। নেতৃত্ব পরিবর্তনের মতো বিষয়ও একটি দলের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। সারোয়ার ইমরানের মতে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ নারী দলের সংকটের একটি বড় অংশ মানসিক। দলকে আত্মবিশ্বাসী ও চাঙা রাখার কাজটি আরও কার্যকরভাবে করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

এর সঙ্গে রয়েছে নারী ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা। সারোয়ার ইমরান বাংলাদেশে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য বয়সভিত্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতার ঘাটতির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, শ্রীলঙ্কায় শত শত স্কুলে মেয়েদের ক্রিকেট চর্চার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে সেই ধরনের বিস্তৃত স্কুলভিত্তিক কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

এই ঘাটতির প্রভাব জাতীয় দলের খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রেও পড়ছে বলে মনে করেন কোচ। তাঁর দাবি, নতুন খেলোয়াড় খুঁজে বের করার জন্য পর্যাপ্ত বিস্তৃত পুল না থাকায় বিকল্প ক্রিকেটারের সংখ্যাও সীমিত। ফলে জাতীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড়দের বাইরে প্রতিযোগিতামূলক মানের বড় একটি গ্রুপ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সমস্যা কাটাতে স্কুল ক্রিকেট, অনূর্ধ্ব-১৮ পর্যায়ের নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং মেয়েদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা উঠে এলে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতাও বাড়বে। একই সঙ্গে একজন খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমবে।

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের সামনে তাই চ্যালেঞ্জটি শুধু একটি ম্যাচ বা একটি টুর্নামেন্টের নয়। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাটিংয়ের আত্মবিশ্বাস ফেরানো যেমন জরুরি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো শক্তিশালী করাও প্রয়োজন। স্কুল থেকে অনূর্ধ্ব-১৮, ঘরোয়া ক্রিকেট হয়ে জাতীয় দল—এই ধারাবাহিক পথ যত বেশি কার্যকর হবে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগও তত বাড়বে।

এশিয়ান গেমসে পদক ধরে রাখতে না পারা সেই বড় ছবিরই একটি অংশ। সারোয়ার ইমরানের বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি মাঠের বাইরের পরিবেশ, খেলোয়াড়দের মানসিক আত্মবিশ্বাস এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্রিকেট কাঠামোর দিকেও সমান নজর দেওয়া প্রয়োজন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।