খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই আগস্ট ২০২৬, ৩:৭ পিএম
কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা স্মরণকালের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮১ জনে দাঁড়িয়েছে। সোমবার আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার এই প্রলয়ংকরী দুর্যোগে আহত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৯৭১ জন। চার দিন পার হয়ে গেলেও ধসে পড়া বিভিন্ন ভবনের স্তূপ সরিয়ে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩৭৯ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বৃহস্পতিবার কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা সারা দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো জানান, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি দ্রুত ত্রাণ বিতরণ দরকার। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, গত এক দশকের মধ্যে এটিই দেশটির ভূখণ্ডে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন। এর উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির সান হোসে দেল পালমারের প্রায় ৩ মাইল পূর্বে। ৭.৪ মাত্রার এই ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি প্রতিবেশী দেশ ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামাতেও তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে।
দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের মহাপরিচালক ডেভিড সান্তিয়াগো তামায়ো সর্বশেষ প্রশাসনিক পরিসংখ্যান জানিয়েছেন। ভূমিকম্পের সার্বিক তাণ্ডব ও ধ্বংসলীলার বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| ক্ষতির খাত/বিবরণ | ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ/সংখ্যা |
| ভূমিকম্পের মাত্রা | ৭.৪ (রিখটার স্কেল) |
| মোট নিহতের সংখ্যা | ২৮১ জন |
| আহতের সংখ্যা | ৩,৯৭১ জন |
| নিখোঁজের সংখ্যা | ৩৭৯ জন |
| সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর | ১২,০০০-এর বেশি |
| আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর | ৭৪,০০০-এর বেশি |
| ধসে পড়া মোট ভবন | ১৭০টির বেশি |
| ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক | ২০০টির বেশি |
| ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সেতু | ২০টি |
| ধসে পড়া পথচারী সেতু | ১টি |
| ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর | ৫টি |
| ক্ষতিগ্রস্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা | ৪৪টি |
ভূমিকম্পের ধাক্কায় দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে চোকো বিভাগের পেরেইরা শহর এবং ভায়ে দেল কাউকা বিভাগের প্রধান শহর কালি। বিশেষ করে ২২ লাখ মানুষের আবাসস্থল কালি শহরেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯৫ জন। কালির দক্ষিণ অংশে ক্লিনিকা কলম্বিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছের একটি বহুতল আবাসিক ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে এখনো অনেক মানুষ চাপা পড়ে আছেন। উদ্ধার কাজে উদ্ধারকারী দলের সাথে অংশ নিয়েছেন কলম্বিয়ান সেনাবাহিনীর তৃতীয় ব্রিগেডের জওয়ানরা। ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবনের সাড়া খুঁজতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর, নাইট ভিশন ও বিশেষ তাপ শনাক্তকারী ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে আশার আলোও দেখা গেছে। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর পেরেইরা শহরের এক ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ৩২ বছর বয়সী এক নারীকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিউইয়র্কের সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে নিউ জার্সির বার্গেনফিল্ডের এক মার্কিন নারীও রয়েছেন, যিনি ভবনের ভেতর আটকে থাকা নিজের মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে ধসে পড়া ছাদের নিচে চাপা পড়েন। স্থানীয় টিমগুলোকে সহায়তা দিতে ইতিমধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশে প্রায় ৪০ সদস্যের একটি বিশেষ নগর অনুসন্ধান ও উদ্ধার দল কলম্বিয়ায় পৌঁছেছে।
প্রলয়ংকরী এই দুর্যোগের পর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। চারদিকে চরম হাহাকার ও স্বজন হারানোর কান্না। রাস্তাঘাট ভেঙে পড়ায় অনেক দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা তত ক্ষীণ হয়ে আসছে, তবুও প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে প্রাণের খোঁজে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন দেশি-বিদেশি দলগুলো।
মন্তব্য