পাবনার সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলোনিয়া গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলি (১০) ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার মোস্তফা প্রামাণিক রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, মাগরিবের নামাজ পড়ার পর শিশুটিকে দোকানের পেছনের একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় এবং এর প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গোপন করার চেষ্টা করা হয়।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর নিখোঁজ হয় কামরুন্নাহার কলি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। নিখোঁজের সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ মোস্তফা প্রামাণিক ও তাঁর ভাড়াটিয়া ইয়াসিন আলীকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই (নি.) বেনু রায় পিপিএমের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে কলি তাঁর ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মোস্তফার মুদি দোকানে চিপস কিনতে যায়। ওই সময় মোস্তফা তাঁর মোবাইল ফোনে শিশুটির কয়েকটি অসংগতিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গির ছবি তোলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, সন্ধ্যায় কলি দোকানের সামনে একটি বেঞ্চে বসেছিল। স্থানীয় সাহেব আলীর স্ত্রী খুশি খাতুন তাঁর সন্তানকে নিয়ে সেখান থেকে বাড়িতে যাওয়ার সময় মোস্তফাকে মাগরিবের নামাজ পড়তে দেখেন। নামাজ শেষ করার পর মোস্তফা কলিকে দোকানের পেছনের একটি কক্ষে নিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। সেখানে শিশুটিকে কয়েক দফা ধর্ষণ করা হয় এবং প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে রিমান্ডে মোস্তফা জানিয়েছেন।
পুলিশ আরও বলছে, ঘটনার পর মোস্তফা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন। রাত ১০টার দিকে তিনি আবার তাঁর মুদি দোকান খোলেন এবং রক্তমাখা শরীর গোসল করে পরিষ্কার করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, কলি নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিশে তাঁর সন্ধানে অংশ নেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তা বেনু রায় বলেন, কলির নিখোঁজের পর মোস্তফা নিহত শিশুটির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। গভীর রাতেও মোবাইল ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে নিখোঁজ শিশুটির বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। এমনকি কলির সন্ধান ও বিচারের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ ও মানববন্ধনেও তিনি অংশ নেন। মরদেহ উদ্ধারের সময়ও তাঁকে সাংবাদিক ও পুলিশের কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখা যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোস্তফাকে শনাক্ত করতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। আটকের সময় তাঁর আচরণে পুলিশের সন্দেহ তৈরি হয়। পরে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধিকে তাঁকে দেখে আসতে বলা হয়। ওই জনপ্রতিনিধি তাঁর এক হাত ধরার পর তিনি কাঁপতে শুরু করেন বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর পুলিশ গিয়ে তাঁকে আটক করে।
মোস্তফার রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে ইয়াসিন আলীও জড়িত ছিলেন। তবে ইয়াসিন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ধর্ষণ বা হত্যার কোনোটির সঙ্গেই তিনি জড়িত নন; হত্যার পর মোস্তফা তাঁর কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন এবং তিনি শুধু মরদেহ গোপনসহ কিছু কাজে সহযোগিতা করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মোস্তফার মোবাইল ফোনে দোকানে আসা বিভিন্ন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের আপত্তিকর ভঙ্গিতে তোলা ছবি পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এসব তথ্য মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুলিশ বলছে, ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত করতে ফরেনসিক ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ। ২১ সেপ্টেম্বর নিহত শিশুর বিভিন্ন আলামত রাজশাহী সিআইডিতে পাঠানোর কথা রয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের ঘটনায় একজন নাকি দুজন জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
বেনু রায়ের ভাষ্য, মোস্তফা দাবি করছেন, দুজন মিলে শিশুটিকে ধর্ষণ করেছিলেন। অন্যদিকে ইয়াসিন বলছেন, তিনি ধর্ষণ ও হত্যার কোনো ঘটনায় জড়িত নন। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে দুই পক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে আলামতের মিল-অমিল যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে আসামিদেরও ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে।
এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, কলিকে ফুঁসলিয়ে মোস্তফার মুদি দোকানের পেছনের একটি কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। পরে মরদেহ বস্তাবন্দি করে ডোবার কাছে গোপন করার চেষ্টা করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসা পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।
এ ঘটনায় পুলিশ দুই আসামিকে হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে পুলিশের দাবি, মোস্তফা দ্রুত স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই তাঁর রিমান্ড শেষ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ডিজিটাল ফরেনসিকসহ কয়েকটি পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তদন্তের বাকি কাজ শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।


