নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
ইতালির রোমে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ভঙ্গ করে মেয়রের দপ্তরে গিয়ে সাক্ষাৎ করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ একাধারে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের গুরুতর অবমাননা, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ড. ইউনূসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত কয়েকটি ছবি ঘিরে। ছবিগুলোতে দেখা যায়, তিনি রোমের মেয়র রবার্তো গোয়ালতিয়েরির দপ্তর ‘ক্যাপিডোগ্লিও’-তে গিয়ে বৈঠক করছেন। ছবিগুলো প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—একজন স্বাধীন দেশের সরকার প্রধান কেন একজন নগরপিতার কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করবেন?
কূটনৈতিক প্রটোকল অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান বিদেশ সফরে গেলে অধস্তন পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা, যেমন মেয়র, প্রথাগতভাবে সফররত নেতার অবস্থানস্থলে (সাধারণত হোটেল বা রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা) গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সম্মান প্রদর্শনের রীতি। কিন্তু ড. ইউনূস নিজেই মেয়রের দপ্তরে গিয়ে সেই প্রটোকল ভেঙেছেন, যা পর্যবেক্ষকদের মতে “নিজের পদমর্যাদাকে খাটো করার মতো ভুল”।
ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন দেখা যায়, ডাবলিনের লর্ড মেয়র এমা ব্লেইন সম্প্রতি একই দপ্তরে গিয়ে রোমের মেয়রের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দুই বৈঠকের ছবির পটভূমি ছিল হুবহু এক, যা স্পষ্ট করে—ড. ইউনূস আসলেই মেয়রের অফিসে গিয়েই সাক্ষাৎ করেছেন। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন বার্তা গেছে যে, বাংলাদেশের সরকার প্রধানের মর্যাদা যেন ডাবলিন শহরের মেয়রের সমপর্যায়ের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বর্ষীয়ান কূটনীতিক বিষয়টিকে বলেছেন “রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতি চরম উদাসীনতা”। তিনি মন্তব্য করেন,“বৈঠকটি হতেই পারত, কিন্তু স্থান নির্বাচনটি ছিল একটি ভয়াবহ ভুল। হয় তাঁরা আন্তর্জাতিক প্রটোকল সম্পর্কে অজ্ঞ, নয়তো তাঁরা এর তোয়াক্কা করেননি। ফলাফল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষুণ্ণ হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে আমাদের দুর্বল করবে।”

ইতালির রাজধানীতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও রোমের মেয়র রবার্তো গোয়ালতিয়েরির এই সাক্ষাৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামি।
সোমবার দিবাগত রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘প্রশ্ন হলো, কে কার সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং কোথায় করলেন? বাংলাদেশের সরকার প্রধান, ইতালির রোম শহরের মেয়র সাহেবের অফিসে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন? নাকি ইতালির রোম নগরীর মেয়র, বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সাথে সাক্ষাৎ করতে তার হোটেল রুমে গেল?’

তিনি প্রশ্ন করে বলেন, ‘প্রটোকল কী বলে? একটি দেশের সরকার প্রধান, তিনি সফর করছেন এমন আরেকটি দেশের শহরের মেয়রের অফিসে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করা কি গ্রহণযোগ্য বা যৌক্তিক?’
যদিও বৈঠকের বিষয়বস্তু এখনও প্রকাশ করা হয়নি, বিশ্লেষকদের মতে আলোচনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই প্রটোকল ভঙ্গের প্রশ্ন। তারা মনে করছেন, এই ঘটনা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কূটনৈতিক অনভিজ্ঞতা ও অপরিণামদর্শিতা প্রকাশ করেছে—যার নেতিবাচক প্রভাব আগামী দিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে।
রাষ্ট্রীয় প্রটোকল মানার প্রশ্নে এমন বিতর্ক এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন, যা দেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে দেখা দিয়েছে।
খবরওয়ালা/এমএজেড