খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই ২০২৫
বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলে কিশোর ও তরুণদের জোর করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) গোপন সামরিক ক্যাম্পে কমব্যাট ট্রেনিং, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কৌশল ও যুদ্ধ কৌশল শেখানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ট্রেনিং শেষে ওই তরুণদের পরানো হয় জলপাই রঙের ছাপা পোশাক, ক্যাপ ও বুট। সেনাবাহিনীর আদলে দেওয়া হয় সামরিক পদবি—ক্যাপ্টেন, মেজর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল, কর্নেল—এবং দলনেতা পরিচিত ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল’ হিসেবে। কেএনএফের এই ঘাঁটি বান্দরবানের রুমা উপজেলার পাহাড়ি এলাকায়, রুমা থানা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে।
গত ২ জুলাই কেএনএফের সামরিক ঘাঁটি কুত্তাঝিরিতে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। পাইন্দু ইউনিয়নের পলতাই পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষে কেএনএ’র দুই সদস্য নিহত হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় দুইটি একে-৪৭ রাইফেল (স্টিলবাট ভার্সন), একটি চাইনিজ রাইফেল, বিপুল পরিমাণ গুলি, স্নাইপার রাউন্ড ও কার্তুজ। উদ্ধার হওয়া চাইনিজ রাইফেলটি পূর্বে রুমার সোনালী ব্যাংকে কেএনএফের ডাকাতির সময় লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল কেএনএফ রুমার সোনালী ব্যাংকে হামলা চালিয়ে পুলিশের দুটি এসএমজি, আটটি চাইনিজ রাইফেল ও আনসার বাহিনীর চারটি শটগান ছিনিয়ে নেয়। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র পরবর্তীতে উদ্ধার হলেও বেশিরভাগ এখনো নিখোঁজ।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—কেএনএফের হাতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ব্যবহৃত অস্ত্রের উপস্থিতি। বিশেষ করে চীন ও মিয়ানমার নির্মিত নতুন ভার্সনের একে-৪৭, স্নাইপার রাইফেল ও ফাইবার ম্যাগাজিনযুক্ত অস্ত্র, যা বাংলাদেশের কোনো বাহিনীর কাছেও এখনো ব্যবহৃত হয় না।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, মিয়ানমারের চিন, রাখাইন, সাগাইং ও কাচিন রাজ্যের সামরিক ঘাঁটি থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মাধ্যমে এসব অস্ত্র পাচার হয়ে আসে বাংলাদেশ সীমান্তে। কেএনএফ ও আরাকান আর্মির মধ্যে অস্ত্র বিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির একটি জোট গড়ে উঠেছে বলে ধারণা গোয়েন্দা সংস্থার।
এছাড়া বান্দরবানের সীমান্তবর্তী রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় গড়ে উঠেছে কেএনএফের শক্ত ঘাঁটি। রোয়াংছড়িকে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে—মিজোরাম সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র এনে সেখান থেকে রুমা ও থানচির দুর্গম পাহাড়ি ঘাঁটিতে পৌঁছানো হচ্ছে রাতের আঁধারে। নেফিউ পাড়া, বাকলাই, তাজিংডং, কেওকারাডং ও বগালেক হয়ে অস্ত্রের চালান পৌঁছায় কেএনএফ ক্যাম্পে।
থানচির রেমাক্রি, ডিম পাহাড়, তিন্দুর বাজার, নাফাখুম, ছোট মোদক, বড় মোদকসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে গড়ে উঠেছে নিরাপদ অস্ত্রাগার ও প্রশিক্ষণ ঘাঁটি। এসব এলাকায় বাঙালি বসতি থেকে দূরে, এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও নেই বললেই চলে।
বর্তমানে বান্দরবান ও রাঙামাটির অন্তত ৯টি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কেএনএফের সক্রিয় ঘাঁটি রয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনী কয়েকটি বড় ঘাঁটি উচ্ছেদ করেছে, তথাপি পাহাড়ের ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন ঘাঁটিগুলো এখনো কেএনএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
খবরওয়ালা/টিএসএন