খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ৯:২২ পিএম
কে বলে বঙ্গবন্ধু সফল প্রশাসক ছিলেন না? বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পরিচালনা করেছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। সেই সময়ের মধ্যে তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে দাঁড় করানোর যে কাজটি করেছিলেন, তার মূল্যায়ন করতে হলে আবেগ নয়, পরিসংখ্যানের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরের বছর, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৯৪ ডলার, যা ১৯৭৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২৭৮ ডলারে। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় বেড়েছিল প্রায় ১৮৪ ডলার বা ১৯৬ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালটিও পুরোপুরি পরিচালনা করতে পারেননি। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বছরের শেষ সময়টা আর তাঁর নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হয়নি। অথচ পরবর্তী বছরগুলোতে মাথাপিছু আয় আবার কমে ১৯৭৬ সালে ১৪১ ডলার এবং ১৯৭৭ সালে ১৩১ ডলারে নেমে যায়। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে যে অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনা হয়েছিল, তার পরের চিত্রটি তাই নিছক রাজনৈতিক পালাবদলের গল্প নয়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল ৮৯ ডলার; পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল ৮৩ ডলার এবং ভারতের ৮২ ডলার। অর্থাৎ পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর থেকেও পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু পরবর্তী ১২ বছরে বৈষম্য, শোষণ ও সম্পদ পাচারের ফলে সেই পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১৯৭২ সালে নেমে আসে ৯৪ ডলারে, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানের আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৫৩ ডলারে। অথচ স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের জীবনমানেরও পরিবর্তন হচ্ছিল। পাকিস্তান আমলের শেষ বারো বছরের গড় প্রত্যাশিত আয়ু ছিল ৪৫ দশমিক ২ বছর; ১৯৭৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫০ দশমিক ৩ বছরে। অর্থাৎ মাত্র সাড়ে তিন বছরে প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছিল ৫ দশমিক ১ বছর বা ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।
কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের পরিসংখ্যানও একই গল্প বলে। ১৯৭২-৭৩ সালের তুলনায় ১৯৭৩-৭৪ সালে কৃষি উৎপাদন বেড়েছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, পশুসম্পদ ও হাঁস-মুরগির উৎপাদন বেড়েছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিল্প উৎপাদন বেড়েছিল ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৭০-৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি ছিল ১২৫ দশমিক ১ কোটি টাকা; মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ১৯৭৪-৭৫ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ৩১৩ দশমিক ৬ কোটি টাকা—প্রায় আড়াই গুণ। আমদানিও বেড়েছিল, কারণ একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করতে তখন বিপুল পরিমাণ খাদ্য, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের Bangladesh Statistics Yearbook-এর তথ্য এসব পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
শুধু অর্থনীতিই নয়, রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছিল। পাকিস্তানি শাসনের শেষ বছরে বাংলাদেশের রাজস্ব বাজেটে ঘাটতি ছিল ৮০৬ কোটি টাকা, যা ছিল রাজস্ব ব্যয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সময়ে ১৯৭২-৭৩ সাল থেকেই রাজস্ব বাজেটে ঘাটতির পরিবর্তে উদ্বৃত্ত দেখা যায়। ১৯৭৪-৭৫ সালে রাজস্ব আয় হয়েছিল ৬ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, বিপরীতে রাজস্ব ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার ১৮২ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল, যা উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হয়েছিল। মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের আর্থিক কাঠামোকে দাঁড় করানোর এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ প্রশাসনের উদাহরণ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
আর বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক কাজ শুধু বাজেট-আয়, মাথাপিছু আয় কিংবা উৎপাদনের হিসাবেই শেষ হয়ে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিল্পকারখানা পুনর্গঠন করতে হয়েছিল। লাখ লাখ শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করতে হয়েছিল। একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হয়েছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো। পরিকল্পনা কমিশন, শিক্ষা কমিশন, কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানসহ একের পর এক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। প্রণয়ন করা হয় দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। জাতীয় সংসদে তৈরি হয় তিন শতাধিক আইন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে শুধু একটি সরকার পরিচালনা করতে হয়নি; তাঁকে একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করাতে হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো তৈরির সেই পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতও বাদ যায়নি। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৭২ সালের ৩১ মে প্রেসিডেন্টস অর্ডার নং ৫৯-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড—বিপিডিবি প্রতিষ্ঠা করা হয়। একইভাবে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্টস অর্ডার নং ২৭-এর মাধ্যমে তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ মিনারেলস, অয়েল অ্যান্ড গ্যাস করপোরেশন—BMOGC গঠন করা হয়, যা পরবর্তীতে পুনর্গঠিত হয়ে পেট্রোবাংলার ভিত্তি তৈরি করে। অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রথম বছরেই বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও জ্বালানি স্বাধীনতার ভিত্তিও তৈরি করতে হবে।
আর সেই চিন্তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্ভবত ৯ আগস্ট ১৯৭৫। আমাদের জাতীয় জীবনে এই দিনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকেই জানেন না। অথচ এই দিনেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তাকে বদলে দেওয়ার মতো একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার বহুজাতিক শেল অয়েল কোম্পানির কাছ থেকে তিতাস, বাখরাবাদ, হবিগঞ্জ, রশিদপুর ও কৈলাশটিলা—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র মাত্র ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিংয়ে কিনে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে। অর্থাৎ তখনকার হিসাবে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাই বিদেশি কোম্পানির হাতে থাকা দেশের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসসম্পদ রাষ্ট্রের হাতে ফিরিয়ে আনার এই সিদ্ধান্ত ছিল নিছক সম্পদ কেনাবেচা নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহারের পরও এই গ্যাসক্ষেত্রগুলো দেশের গ্যাস উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তেল-গ্যাস খাতের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসা—এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি জ্বালানি নীতির ভিত্তি নির্মাণের ধারাবাহিক পদক্ষেপ।
এরপর আসে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি। একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া ছিল বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশ প্রায় ১২০টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। সৌদি আরব ও চীনের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিশ্বের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশ যোগ দেয় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে এবং ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে। অর্থাৎ একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, সদ্য স্বাধীন দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দ্রুত প্রতিষ্ঠিত করার কাজটি বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল।
আর সংবিধান? পৃথিবীর বহু পুরোনো দেশও সংবিধান প্রণয়নে বছরের পর বছর সময় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন ও কার্যকর হওয়ার পথ পাড়ি দিতে লেগেছিল দীর্ঘ সময়, ভারতের লেগেছিল দুই বছরেরও বেশি এবং পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান পেতে লেগেছিল প্রায় নয় বছর। সেখানে স্বাধীনতার মাত্র ১০ মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ পেল একটি লিখিত সংবিধান। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর তা কার্যকর হয়। একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে দ্রুত রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত্তি স্থাপনের উদাহরণ খুব বেশি নেই।
একটি সদ্য স্বাধীন দেশ, যার যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত, শিল্পকারখানা বিপর্যস্ত, অর্থনীতি ভেঙে পড়া, খাদ্যসংকট তীব্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যার কোনো প্রতিষ্ঠিত অবস্থান নেই। সেই দেশকে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটি সংবিধান দেওয়া, প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসসম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা এবং অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের পথে নিয়ে যাওয়া—এসবই বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক উত্তরাধিকারের অংশ।
তাই প্রশ্নটা আবারও করা যায়—সফল প্রশাসকের সংজ্ঞা কী? একটি প্রস্তুত রাষ্ট্রকে পরিচালনা করা, নাকি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণ করা? যদি দ্বিতীয়টিও সফল প্রশাসনের অন্যতম মানদণ্ড হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসকে নতুন করে পড়তে হবে। কারণ তিনি শুধু একটি সরকার চালাননি; তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সাংবিধানিক এবং জ্বালানি ভিত্তি নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। আর ৯ আগস্ট ১৯৭৫-এর সেই পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত আজও প্রমাণ করে—বঙ্গবন্ধুর চিন্তা শুধু তখনকার সংকট মোকাবিলায় আটকে ছিল না, তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথাও ভাবতেন।
কে বলে বঙ্গবন্ধু সফল প্রশাসক ছিলেন না? কে বলে, কে?
– সাব্বির আহমেদ
মন্তব্য