খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৪৭ পিএম
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর পরিচালিত সবচেয়ে সফল ও দুঃসাহসিক গেরিলা অভিযানগুলোর একটি ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’। এই অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র, রসদ ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানে বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা।
১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট দিবাগত রাত পেরিয়ে ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরে প্রায় একই সময়ে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে আক্রমণ চালায় নৌ-কমান্ডোদের পৃথক দল। একই অভিযানের অংশ হিসেবে ভোরে মংলা সমুদ্রবন্দরেও চালানো হয় সফল আক্রমণ। অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যবহৃত ও তাদের সহযোগিতাকারী বিদেশি জাহাজসহ বেশ কয়েকটি অস্ত্র ও রসদবাহী জাহাজ ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যেভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল অপারেশন জ্যাকপট :
নৌ-কমান্ডোদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে পাকিস্তানি বাহিনীর নৌ-যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত হানার পরিকল্পনা করা হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রথম ব্যাচের কমান্ডোদের চারটি পৃথক দলে ভাগ করা হয়। প্রতিটি দলকে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু।
চারটি দলের লক্ষ্য ছিল—
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর
মংলা সমুদ্রবন্দর
চাঁদপুর নদীবন্দর
নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর
দলগুলোর মধ্যে দুটি দলে ছিল ৬০ জন করে এবং অন্য দুটি দলে ছিল ২০ জন করে নৌ-কমান্ডো।
অভিযানের গোপনীয়তা বজায় রাখতে দলনেতাদের সঙ্গে বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়। এই সংকেত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তারা। কলকাতা আকাশবাণীর কয়েকজন কর্মকর্তাকেও এই গোপন পরিকল্পনার অংশ করা হয়েছিল।
দুটি গানই ছিল আক্রমণের সংকেত-
অপারেশন জ্যাকপটের সবচেয়ে অভিনব দিক ছিল গোপন সংকেত হিসেবে দুটি বাংলা গানকে ব্যবহার করা। প্রথম সংকেত হিসেবে নির্ধারিত ছিল আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি’ গানটি। এই গান প্রচারের পর কমান্ডোদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ হিসেবে ধরা হতো।
এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় সংকেত হিসেবে প্রচারিত হওয়ার কথা ছিল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান’। দ্বিতীয় গানটি শোনার অর্থ ছিল—এবার নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ শুরু করতে হবে।
গানগুলোর সম্প্রচারের সময় ও বেতার তরঙ্গ সম্পর্কিত তথ্য কেবল সংশ্লিষ্ট দলনেতারাই জানতেন। ফলে সাধারণ শ্রোতাদের কাছে এগুলো ছিল নিছক বাংলা গান, কিন্তু নৌ-কমান্ডোদের কাছে ছিল জীবন-মরণ অভিযানের গোপন সংকেত।
হরিনা ক্যাম্প থেকে লক্ষ্যবস্তুর পথে :
পরিকল্পনা অনুযায়ী নৌ-কমান্ডোদের দলগুলো কলকাতার পলাশীর হরিনা ক্যাম্প থেকে নিজ নিজ লক্ষ্যবস্তুর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। অভিযানে অংশ নেওয়া কমান্ডোদের প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়।
প্রত্যেক কমান্ডোর কাছে ছিল একটি করে লিমপেট মাইন, ছুরি, একজোড়া সাঁতারের ফিন এবং শুকনো খাবার। প্রতি তিনজন কমান্ডোর জন্য দেওয়া হয় একটি স্টেনগান। দলনেতাদের দেওয়া হয় ট্রানজিস্টার, যার মাধ্যমে তারা গোপন সংকেত ও নির্দেশনা গ্রহণ করতেন।
অভিযানের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ আগস্ট দিবাগত রাত, অর্থাৎ ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহর।
গভীর রাতে শুরু হয় অভিযান :
১৬ আগস্ট রাত প্রায় ১টার দিকে নৌ-কমান্ডোরা চূড়ান্ত অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। রাত ১টা ১৫ মিনিটের দিকে তারা পানিতে নেমে নির্ধারিত জাহাজের দিকে সাঁতরে এগিয়ে যান। নিঃশব্দে জাহাজের কাছে পৌঁছে কমান্ডোরা নিজেদের সঙ্গে থাকা মাইনগুলো লক্ষ্যবস্তু জাহাজের গায়ে স্থাপন করেন। এরপর সাঁতরে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান।
রাত প্রায় ১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর একে একে বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকা। ভোরের দিকে মংলা বন্দরে শুরু হয় আরেকটি অভিযান। ভোর সাড়ে ৬টার পর সেখানে একের পর এক মাইন বিস্ফোরিত হতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আঘাত হানে এই বিস্ফোরণগুলো।
পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর বড় ধাক্কা :
অপারেশন জ্যাকপট পাকিস্তানি বাহিনীর নৌ-যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। একসঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নদী ও সমুদ্রবন্দরে হামলা চালানোর ঘটনা পাকিস্তানি বাহিনীকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য অস্ত্র ও রসদ পরিবহনকারী একাধিক জাহাজ ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করা কয়েকটি বিদেশি জাহাজও ছিল। এই অভিযান শুধু সামরিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্ষতি করেনি; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা ও বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বার্তা পৌঁছে দেয়।
আত্মত্যাগ করেছিলেন নৌ-কমান্ডোরা :
অপারেশন জ্যাকপটে অংশ নেওয়া নৌ-কমান্ডোদের অনেকেই জীবন বাজি রেখে অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁদের কয়েকজন শহীদ হন, কেউ নিখোঁজ হন।
শহীদ নৌ-কমান্ডোদের মধ্যে ছিলেন—
কমান্ডো আব্দুর রাকিব — ফুলছড়ি ঘাট অপারেশনে শহীদ হন।
কমান্ডো হোসেইন ফরিদ — চট্টগ্রামে দ্বিতীয় অপারেশনের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হয়ে শহীদ হন।
কমান্ডো খবিরউজ্জামান — ফরিদপুরের দ্বিতীয় অপারেশনে শহীদ হন।
এ ছাড়া কমান্ডো সিরাজুল ইসলাম, এম আজিজ, আফতাব উদ্দিন ও রফিকুল ইসলাম অপারেশন চলাকালে নিখোঁজ হন।
ইতিহাসে অমর ‘অপারেশন জ্যাকপট’ :
অপারেশন জ্যাকপট ছিল শুধু কয়েকটি বন্দরে হামলা নয়; এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত, গোপন ও সমন্বিত নৌ-গেরিলা অভিযান। সীমিত অস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে প্রশিক্ষিত বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী নৌ-সরবরাহ ব্যবস্থায় যে আঘাত হেনেছিলেন, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অভিযানে অংশ নেওয়া নৌ-কমান্ডোদের সাহস, কৌশল ও আত্মত্যাগ আজও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
অপারেশন জ্যাকপটের সকল শহীদ ও নিখোঁজ নৌ-কমান্ডোসহ মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সকল বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
সুত্রঃ
– বই : মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডো- বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর রফিকুল ইসলাম
– বেলাল হোসেন মৃধা, বীর মুক্তিযোদ্ধা (নৌ কমান্ডার)
মন্তব্য