এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম বৃহৎ ও কৌশলগত স্থাপনা মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। সেই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেল—অথচ জাতীয় গণমাধ্যমে নেই তেমন কোনো আলোড়ন। নেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নেই রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির জোরালো প্রশ্ন। এই নীরবতা শুধু বিস্ময়কর নয়; এটি সরাসরি জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা ও নাগরিক আস্থার জন্য এক গভীর হুমকি।
এই নিশ্চুপতা কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপশা থেকে পাথুরিয়া—প্রতিদিনই ঘটছে খুন, ধর্ষণ, বলৎকার, মব সহিংসতা, ডাকাতি, চুরি, প্রতারণা, জবরদখল এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন। অথচ এসব ঘটনার অধিকাংশই দায়সারা কিছু লাইনের খবরে চাপা পড়ে যায়, কিংবা আদৌ সব গণমাধ্যমে প্রকাশই পায় না। ফলে অপরাধ ধীরে ধীরে সমাজে “স্বাভাবিক” হয়ে উঠছে, আর অপরাধীরা পাচ্ছে নীরব উৎসাহ ও অদৃশ্য প্রশ্রয়।
সংবাদ যখন আড়াল করা হয়, তখন অপরাধ বাড়ে—এটি কোনো ধারণা বা মতামত নয়, এটি নির্মম বাস্তবতা। মিডিয়া যখন তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। মানুষ ভাবতে শুরু করে—সংবাদ মানেই সত্য নয়, আবার সত্য মানেই সংবাদ নয়। এই অনাগ্রহ ও অবিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় এক ভয়ংকর ‘চেপে যাওয়ার সংস্কৃতি’। তৈরি হয় এক বিশাল শূন্যতা, যেখানে বিশৃঙ্খলা চরমে ওঠে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জমতে থাকে গভীর ক্ষোভ ও অনাস্থা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই নীরবতার সুযোগ নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ। ঘটনার গভীরে না গিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া, “সব নিয়ন্ত্রণে” বলে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়া কিংবা ক্ষমতাবানদের রক্ষা করার অভিযোগ আজ আর বিচ্ছিন্ন নয়। মিডিয়া প্রশ্ন না করায় জবাবদিহির জায়গাটুকুও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব পালনের বদলে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে দায়মুক্তির সংস্কৃতি।
গণমাধ্যম কোনো দলের মুখপাত্র নয়, কোনো গোষ্ঠীর ঢালও নয়। গণমাধ্যম হলো জনগণের চোখ ও কণ্ঠ। সেই চোখ বন্ধ থাকলে রাষ্ট্র অন্ধ হয়ে পড়ে, আর কণ্ঠ স্তব্ধ থাকলে অন্যায়ই সবচেয়ে জোরে কথা বলে। আজ যে নীরবতা আমরা দেখছি, তা নিরপেক্ষতা নয়—এটি কার্যত অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোরই নামান্তর।
আজ প্রয়োজন এই নীরবতা ভাঙার সাহস।
প্রয়োজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সত্য প্রকাশের দৃঢ়তা এবং ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলার স্পষ্ট অবস্থান। অন্যথায় একদিন এই নিশ্চুপ থাকার দায় শুধু মিডিয়ার ঘাড়ে নয়—রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজ—সবাইকে বহন করতে হবে।
নিশ্চুপতা কখনো সমাধান নয়।
নিশ্চুপতা অনেক সময় অপরাধের সবচেয়ে বড় সহচর।
এই সত্য যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করব, তত দ্রুতই হয়তো এই ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাব—জাতি হিসেবে, সমাজ হিসেবে, এবং আমরা সবাই—যারা দেশটাকে অসম্ভব ভালোবাসি।
তাই আসুন, সৎ সাহস নিয়ে সত্য প্রকাশ করি।
নিরন্তর দেশ, জাতি ও জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে সত্য বলি।
এই কাজটি আজই শুরু করুন—কারণ আগামীকাল দেরি হয়ে যেতে পারে।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক – খবরওয়ালা।