হুমায়ূন শফিক
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ মার্চ ২০২৫
টেবিলের ওপরে অনেকগুলো সাদা কাগজ। সবগুলোতেই কালো কালির এলোপাতাড়ি দাগ। যেন কলম দিয়ে অযথাই আঘাত করা হয়েছে কাগজের বুকে। যে লোকটা কলম দিয়ে দাগ কেটেছে, সে এখন টেবিলে মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছে নির্বিঘ্নে। ঠিক রাত দুইটায় জেগে উঠবে। ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া। এই সময়ে জেগে ওঠা ধরতে গেলে তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সপ্তাহে তিন দিন সে রাত দুইটায় জেগে ওঠে।
জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে রাস্তার সামান্য আলো এসে রুমকে ফোঁটা ফোঁটা আলো দিয়ে ভরিয়ে তুলেছে। ওই রুমে কেউ প্রবেশ করলেই আলোর নরম পরশে তার শরীর ভরে উঠবে।
অ্যালার্ম বাজার পরে :
কাদরি জেগে ওঠে। তার শরীরে অন্য রকম এক তেজ লক্ষ করা যায়। দ্রুততার সঙ্গে নির্ধারিত পোশাক পরে বারান্দা দিয়ে বেয়ে বেয়ে নিচে নামে। পকেটে তিনটা পেনসিল ও একটি কলম ভরতে ভুল করে না। রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যায়। যাত্রীসমেত কয়েকটা রিকশা তার সামনে দিয়ে চলে যায় । কাউকে সে গ্রাহ্য করে না, নিজের মতো করে হাঁটতে থাকে।
একজন কবি :
কাদরির পরিচয়টা এখানে দিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ, গল্পের প্রধান চরিত্রকে যদি আপনারা ঠিকমতো ধরতে না পারেন, তাহলে গল্পটাও তেমন বুঝতে পারবেন না। কাদরি একজন কবি। তার কবিতার বিষয় : মৃত্যু। মৃত্যুবিষয়ক কবিতা লিখতে নিজেও কয়েকবার আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। পরে সে অনেক ভেবেছে, কিন্তু রহস্যের কোনো কিনারা করতে পারেনি। মৃত্যুরহস্য কেউ এখনো জানে না। কিন্তু জানার চেষ্টা যে হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার কবিতার বই বাজারে একটিই। সেই বইটি নিয়ে পাঠকদের মাঝে উচ্ছ্বাস লক্ষ করার মতো। তার বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। মাঝারি সাইজের দেহ। দেখতে-শুনতে তো বেশ সুপুরুষই বলা যায়। তাকে দেখলেই লোকজন সুপুরুষ হিসেবেই চিহ্নিত করবে। পরিচয়পর্ব শেষ। বাকিটা সম্পূর্ণ গল্প পড়লেই জানতে পারবেন, এইটুকু প্রয়োজন ছিল বলেই দিলাম।
২. অ্যালার্ম বাজার পরে :
হাঁটতে হাঁটতে ছোট্ট একটি গলিতে চলে আসে। সেখানে সংরক্ষিত লাল রঙের সাইকেলটা তার প্রিয়। এটা চালিয়ে যায় দূরের হাইওয়ে রাস্তায়।
সাইকেলে চড়ে প্যাডেলে পা রাখে। অন্য একটি সরু গলি ধরে চালাতে থাকে। সরু গলি দিয়ে যাওয়াটা নিরাপদ। কারোর চোখে পড়ার ভয় নেই। চালাতে চালাতে মেইন রোডে চলে আসে। মেইন রোড থেকে পাঁচ মিনিটের পথ হাইওয়ে।
হাইওয়েতে পৌঁছে প্রথমেই সাইকেলটা লুকিয়ে রাখে একটি ঝোপের ভেতরে। প্রত্যেকবার যে রকম করে আরকি। তার সবুজ পোশাকের ফলে সবুজ গাছগুলোর পাশেই যে সে দাঁড়িয়ে আছে এই অন্ধকারে, কারোর বোঝার ক্ষমতা নেই। সে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। কখন প্রতীক্ষিত লোকটি চলে আসবে।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে একটি বাইকের শব্দ শোনা যায়। কেউ দ্রুতবেগে বাইক চালিয়ে আসছে। কাদরির কান খাড়া হয়ে যায়। শব্দ বেড়ে যায়। একটা মাঝারি সাইজের গাছের কাণ্ড রাস্তায় ফেলল সে। আর কোনো গাড়ি এলে অবশ্য সমস্যা হবে, ভাবল। ঝোপের ভেতরে ঢুকে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
বাইকটা ডালটায় এসে আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা ছিটকে চলে গেল রাস্তার নিচে। বাইক উড়ে পড়ল ঝোপের মধ্যে। কাদরি দৌড়ে গিয়ে লোকটিকে ধরল।
বেশি ব্যথা পেয়েছেন, জিজ্ঞেস করল কাদরি।
উঠতে পারছি না, ভাই। একটু ধরুন।
কাদরি তাকে ধরে উঠাল। ধীরে ধীরে রাস্তার পাশে এনে বসাল।
পানি খাবেন?
গলা হঠাৎ করেই কেন যেন শুকিয়ে গ্যাছে, দেন একটু। কাদরি অবাক হয়ে দেখল লোকটির তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।
একটা বোতল তার হাতে ধরিয়ে দিল। লোকটা ঢকঢক করে পানি পান করতে লাগল। পান করা শেষে বোতলটি ফেরত দিল।
অনেক ধন্যবাদ, ভাই।
ধন্যবাদের কিছু নেই, ডালটাল কারা যে ফেলে রাখে।
হয়তো ডাকাত হবে।
হতে পারে, উদাস ভঙ্গিতে বলল কাদরি, কোথায় যাচ্ছেন?
হাসপাতালে, আমার ছেলে হয়েছে। লোকটা আনন্দ লুকাতে পারল না। তাকে দেখেই বোঝা গেল অসম্ভব রকমের আনন্দিত।
বেশ খুশির খবর।
আপনি যাবেন কোথায়?
কোথাও না, এমনি ঘুরতে বের হয়েছিলাম।
এত রাতে কেউ ঘুরতে বের হয় বুঝি? বলেই মৃদু হাসল লোকটা, কী করেন, ভাই?
আমি কবি। কবিতা লিখি।
ও, আচ্ছা। এখন বুঝতে পেরেছি কেন এত রাতে বের হয়েছেন। যা-ই হোক, এখন মনে হয় যেতে পারব, আপনার জন্য আজকে প্রাণ রক্ষা হলো, আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।
মনে হয় যেতে পারবেন না। আপনার অবস্থা ভালো ঠেকছে না।
আরে ভাই, পারব পারব। বলেই লোকটি দাঁড়িয়ে গেল।
কিছু মনে করবেন না, আপনাকে আমি খুন করব। আবার উদাস ভঙ্গিতে বলল কাদরি। যেন খুন করা কোনো ঘটনাই না।
ভাই তো দারুণ মজা করতে পারেন, মাত্রই প্রাণ বাঁচালেন, আর এখনই খুন করতে চাচ্ছেন।
সত্যি বলছি, আপনাকে আমি খুন করার জন্যই বাঁচিয়েছি। মরার আগে জেনে নিন, আপনার সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা ছিল না, ভবিষ্যতে থাকবে না। আপনার বাইক বা টাকা কিছুই চাই না, শুধু আপনাকে খুন করতেই চাই।
কয়েকটা ট্রাক চলে গেল মাটি কাঁপিয়ে। লোকটার শরীরও কেঁপে উঠেছে। সে বুঝতে পারছে না তার শরীর কেন কাঁপছে।
কী সব বলছেন, আমার ছেলে হয়েছে, তাকে দেখতে যাব। এখন বাজে কথা রাখুন। বলতে বলতে সে ঢলে পড়ল।
কাদরি তাকে পানির সঙ্গে অল্প পরিমাণে জ্ঞান হারানোর ওষুধ দিয়েছিল। যাতে একটু সময় নিয়ে জ্ঞান হারায়। যাকে খুন করবে, তার সঙ্গে গল্পগুজব করতে খারাপ লাগে না।
লোকটার দেহকে টানতে টানতে রাস্তার নিচে নামাল। পাশেই ছোট্ট একটা খাল। পাড়ে একটি নৌকা বাঁধা। লোকটাকে সেই নৌকায় উঠিয়ে বাইতে আরম্ভ করল। ওপার গিয়ে লোকটাকে কাঁধে ফেলে চলতে লাগল। একদম জনশূন্য জায়গায় এসে তাকে ধাপ করে নামিয়ে রাখল। একটানা শিয়ালের ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না এমনকি হাইওয়ে দিয়ে বড় ট্রাকের শব্দও কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না।
লোকটাকে যে ওষুধ দেওয়া হয়েছে, তার জ্ঞান একটু পরেই ফিরে আসবে, তবে শরীর ভয়ংকর রকমের দুর্বল থাকবে, এতটাই যে উঠে দাঁড়াতে পারবে না।
আধো জ্যোৎস্নায় লোকটাকে মনে হচ্ছে ঘুমন্ত শিশু। রাজপুত্রের মতন চেহারা। তার ছেলে হবে, সে-ও নিশ্চয় এই রকমই হবে। কাদরির বুকের এক পাশে কিছুটা কষ্ট জমা হলো লোকটি তার ছেলেকে দেখতে পারবে না বলে। কিন্তু কিছুই করার নেই, তাকে খুন তো করতেই হবে।
লোকটির জ্ঞান ফিরে এল। উঠে বসল অনেক কষ্টে। দাঁড়ানোর চেষ্টাও করল, কিন্তু ব্যর্থ হলো।
কষ্ট করবেন না, প্লিজ। আপনার জন্য কষ্ট অপেক্ষা করছে।
আপনি কে? আমাকে কেন মারবেন?
আমি কে আগেই বলেছি? আপনার নাম বলুন?
ইউনুস খান। কিন্তু…
কিন্তু কিন্তু করবেন না…কীভাবে মরতে চান বলুন।
কেউ কি মরতে চায়?
কেউ কেউ চায়, আপনিও চাইবেন।
কাদরি তখন পেনসিল বের করে লোকটির দু্ই হাতে গেঁথে দিল, সেখান দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটার মতো রক্ত পড়তে লাগল। লোকটি চিৎকার করার চেষ্টা করেও না পেরে কাদরির দিকে তাকিয়ে রইল। কাদরির চোখমুখ প্রায় ভাবলেশহীন।
চিন্তা করবেন না, আপনার ছেলেকে দেখে আসব।
আপনি চিনবেন কীভাবে?
সে চিনে নেওয়া যাবে।
দরকার নেই, আপনি যাবেন না। আমাকে মারছেন মারুন, আমার ছেলেকে বাঁচতে দিন।
কাদরি হেসে উঠল। তার হাসি ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। শিয়ালের ডাকের সঙ্গে মিশে গেল সেই হাসি।
তৃতীয় পেনসিলটি একটি চোখে সম্পূর্ণ ঢুকিয়ে দিল। গিয়ে মগজ পর্যন্ত আঘাত করল। লোকটি হাত-পা ছড়িয়ে ছাট পাড়তে লাগল ঠিক মুরগির মতো।
এই দৃশ্যটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে কাদরির মাথায় একটি কবিতা ভর করল, কিন্তু নাম ঠিক করতে পারল না। তৃতীয়বারেই কিছুই হয় না সে জানে। তাই কলমটি বের করল। কলমটি একদম নাভি বরাবর ঠেলে দিল। লোকটির শরীরের একটি ঝাঁকি খেল যেন। সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধ সবকিছু। কলমটি ঠেলে আরও ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। প্রায় পিঠ পর্যন্ত।
ঠিক তখনই তার মাথায় কবিতার নাম ও সম্পূর্ণ বিষয়টা এল।
দ্রুত সে নিজের বাসায় এসে লাইট জ্বালিয়ে সাদা কাগজে লিখতে আরম্ভ করল। কবিতার নাম দিল— খুন করার দ্বিতীয় পদ্ধতি।