খুলনা নগরীর কেন্দ্রস্থলে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সামনে থেকে সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে দিনদুপুরে তুলে নিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বেলা পৌনে ৩টার দিকে অত্যন্ত জনবহুল এলাকা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে আসা একদল সশস্ত্র যুবক তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। ঘটনাটি ঘিরে পুরো সরকারি দপতর ও স্থানীয় এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে দাপ্তরিক কাজের বিরতি চলাকালে খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যালয় থেকে বের হয়ে একটি রিকশায় ওঠেন সদর সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডল। ঠিক তখনই চারটি মোটরসাইকেলে চেপে হঠাৎ কয়েকজন যুবক এসে তার পথ রোধ করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্তত দুজন যুবক জোর করে তার রিকশায় উঠে বসে এবং একজন হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরে যাতে তিনি চিৎকার করতে না পারেন। কিছু দূর যাওয়ার পর তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে একটি মোটরসাইকেলে তুলে নগরীর কালীবাড়ি ঘাটের দিকের একটি দোকানের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়।
সরকারি দপ্তরের সামনে থেকে সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার অপহরণের সংবাদটি চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তড়িঘড়ি করে ঘাট ও রূপসা নদীর তীরবর্তী এলাকায় তল্লাশি ও অভিযান শুরু করে। ঘটনার প্রায় ৪০ মিনিট পর এক রহস্যজনক পরিস্থিতিতে অপহৃত সাব-রেজিস্ট্রারকে আবার রিকশায় করে তার দপ্তরে ফিরিয়ে দিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ফেরত আসার সময় তাকে চরম ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত দেখায়।
অভিযোগ উঠেছে, ভীতিপ্রদর্শন ও ভয় দেখিয়ে তাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফিরে আসার পর কারা বা কেন তাকে তুলে নিয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দিতে রাজি হননি তিনি। প্রথমে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তন্ময় কুমার মণ্ডল কিছুটা আমতা-আমতা করে জানান যে কয়েকজন যুবক তাকে কালীবাড়ি ঘাটের একটি দোকানে নিয়ে গিয়ে কিছু দাপ্তরিক কাগজের বৈধতা পরীক্ষা করতে বলেছিল। যাচাই শেষে তারা নিজেরাই তাকে রিকশা ডেকে কার্যালয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।
তবে পরবর্তীতে সাংবাদিকদের চাপের মুখে তার ভেতরের ক্ষোভ ও দৃঢ়তা প্রকাশ পায়। নিজের অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে তিনি সরকারি দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন এবং কোনো ধরনের অসদুপায় বা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হতে আসেননি। আপসহীন মনোভাব প্রকাশ করে তিনি সাফ জানান, দুর্নীতিবাজ কারও সঙ্গে তিনি কোনো ধরনের সমঝোতায় যাবেন না এবং অবৈধ উপায়ে কারও টাকাও গ্রহণ করবেন না। তার এমন বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, জোরপূর্বক কোনো অবৈধ জমির দলিল সম্পাদন বা দুর্নীতিমূলক কাগজে স্বাক্ষর করানোর জন্যই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রূপসা নদীসংলগ্ন কালীবাড়ি ও ঘাটের আশপাশের এলাকায় খুলনার আলোচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘বি কোম্পানি’-র ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এর আগেও একটি চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের ঘটনায় এই সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছিল। ফলে এই ঘটনায়ও ওই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সাধারণ মানুষ।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং নদীর ঘাট এলাকায় সাঁড়াশি তল্লাশি শুরু করে। পুলিশি তৎপরতার মুখে কিছুক্ষণের মধ্যেই সাব-রেজিস্ট্রার অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসেন। কারা এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এবং তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিশ্চিত হতে জোর তদন্ত চালোনো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।


