গাছ চুরির অভিযোগে বিএনপির ৬২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা, চুরি এবং চুরিকৃত কাঠ কেনাবেচার অভিযোগে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে বন বিভাগ। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) চুনারুঘাট থানায় মামলা দুটি করা হয়।

এর মধ্যে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গাছ কাটা, চুরি এবং চুরিকৃত গাছ কেনাবেচার অভিযোগে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে একই ধরনের অভিযোগে আরও ৪২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটার অভিযোগের পর এসব মামলা করা হলো।

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের মামলাটি করেন সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন। মামলাটি বন আইন, ২০০০ সালে সংশোধিত আইনের ২৬(১ক)-এর (খ) ও (ঘ) ধারায় করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা এবং পরে সেগুলো চুরি করে কেনাবেচা করা হয়েছে। একটি গোপনীয় প্রতিবেদনে গাছ কাটা, চুরি এবং চুরিকৃত গাছ কেনাবেচার সঙ্গে ২০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়াকে। তাঁর বিরুদ্ধে গাছ কাটা ও চুরির পাশাপাশি চুরিকৃত গাছ কেনাবেচার সঙ্গেও সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এজাহার অনুযায়ী, ১২ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি গাছ কাটা ও চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আর আটজনের বিরুদ্ধে চুরিকৃত গাছ কেনার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীর পাশাপাশি কাঠ ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন।

গাছ কাটা ও চুরির অভিযোগে করা মামলায় মারুফ মিয়া ছাড়াও সাতছড়ি উদ্যানের সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম আবুল, চুনারুঘাট পৌর শহরের উত্তর আমকান্দি এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী মুনায়েমসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।

অন্যদিকে চুরিকৃত গাছ কেনার অভিযোগে করা অংশে উপজেলা শ্রমিকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর খান, উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মিয়া মহলদার, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক করিম সরকার, কাঠ ব্যবসায়ী বেলাল এবং আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে মিরাশী ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগের নামও রয়েছে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মারুফ মিয়া। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তাঁকে ষড়যন্ত্র করে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং গোপনীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে।

চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম জানিয়েছেন, বন বিভাগ অবৈধ গাছ কাটা ও চুরির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

রেমা-কালেঙ্গায় আরও ৪২ আসামি

একই দিনে রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে গাছ চুরি ও বিক্রির অভিযোগে আরও ৪২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বন বিভাগ। রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বন কর্মকর্তা এইচ এম এরশাদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

রেমা-কালেঙ্গাও দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় অবৈধভাবে গাছ কাটা, কাঠ চুরি ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। ফলে একই দিনে দুই সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে ঘিরে পৃথক মামলা হওয়ার বিষয়টি বন সংরক্ষণে নজরদারি বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চুনারুঘাটের প্রায় ২৪০ হেক্টর বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। উদ্যানটিতে সাতটি পাহাড়ি ছড়া রয়েছে এবং বন বিভাগের আওতায় সাতছড়ি ও তেলমাছড়া নামে দুটি বিট রয়েছে। পাহাড়ি বন, ছড়া ও ঘন সবুজ উদ্ভিদে সমৃদ্ধ এই এলাকা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটা শুধু বনসম্পদ কমিয়ে দেয় না; এর প্রভাব পড়ে মাটির স্থিতিশীলতা, জলাধার, উদ্ভিদ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের ওপরও। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে গাছ কাটলে ভূমিক্ষয় ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বন বিভাগের পৃথক দুটি মামলায় মোট ৬২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় এখন তদন্তের ফলের দিকে নজর থাকবে। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তদন্তে নির্দোষ কেউ মামলায় জড়িত হয়ে থাকলে সেটিও যাচাই করার সুযোগ থাকবে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ কাঠের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বনভূমিতে অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর