উৎপল দাস
প্রকাশ: সোমবার, ৪ আগস্ট ২০২৫
বাংলাদেশের সুমহান মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার প্রতীক হয়ে ওঠা একজন যোদ্ধার নাম এম হারুন-অর-রশিদ। যুদ্ধকালীন সময়ে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে তিনি ছিলেন এক দুর্ধর্ষ গেরিলা নেতা। তার নেতৃত্ব ও পরিকল্পনায় সংঘটিত হয় একাধিক সাফল্যজনক অভিযান, যা পাকিস্তানি বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দেয়।
একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি আখাউড়া-মুকুন্দপুর রেলপথে তার নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক দুঃসাহসিক অ্যাম্বুশ। আগে থেকে বিস্ফোরক স্থাপন করে রেলপথের এক স্থানে অপেক্ষমাণ তিনি ও তার সহযোদ্ধারা ট্রেন আসামাত্র সুইচ টিপে বিস্ফোরণ ঘটান। এতে ট্রেনের ক্ষতি হয় এবং কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। এটি ছিল প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধের এক তাৎপর্যপূর্ণ পর্ব।
পরে কসবা ও আখাউড়ায় সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে নিজের উপস্থিতি জানান দেন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কালাছড়া চা-বাগানে চালানো অভিযানে তিনি নেতৃত্ব দেন মুক্তিবাহিনীর দুটি কোম্পানির। হাবিলদার হালিম শহীদ হলেও হারুন-অর-রশিদের দল আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্প দখল করে। এই যুদ্ধে প্রায় ১০০টি অস্ত্র উদ্ধার এবং ২৭ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। যুদ্ধের পর কালাছড়া মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষিত হয়। এসব অবদানের জন্য তিনি ‘বীর প্রতীক’ খেতাব লাভ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এম হারুন-অর-রশিদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং এক সময় সেনাবাহিনী প্রধানের পদ অলংকৃত করেন। এরপর তাঁকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বও পালন করতে দেখা যায়।
তবে তাঁর জীবনে সব অধ্যায় আলোয় রাঙানো ছিল না। ২০০৬ সালে তিনি বিতর্কিত ডেসটিনি গ্রুপে প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। ডেসটিনির বিরুদ্ধে বিশাল অঙ্কের অর্থপাচার, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সরকারি সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে। তদারকির ফলাফলে উঠে আসে শত শত কোটি টাকার অনিয়ম, জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের প্রমাণ। পরবর্তীকালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও পরে জামিনে মুক্ত হন। ২০২২ সালের ১২ মে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ড ও ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে।
তার এই পতনের অধ্যায় অনেকের কাছেই হতবাক করা। একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি এক সময় দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তার নাম এমনভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠবে; সেটা কেউ ভাবেননি। তবুও ইতিহাসে তিনি থেকে যাবেন এক অনন্য যোদ্ধা হিসেবে, যিনি শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলেন নিরস্ত্র জনতার পক্ষ হয়ে।
২০২৫ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম ক্লাবে নিঃসঙ্গ মৃত্যু তাঁর জীবনের অন্তিম ছায়াপথে পরিণত হয়। কেউ ডাকেনি, কেউ জানতেও পারেনি তার মৃত্যুক্ষণে পাশে কেউ ছিল কিনা। কিন্তু জাতি মনে রাখবে সেই হারুন-অর-রশিদকে, যিনি যুদ্ধ করেছিলেন বুক চিতিয়ে, পাকিস্তানি ঘাঁটি দখলে রেখেছিলেন সাহসের মশাল জ্বেলে।
আজ তার জন্য প্রার্থনা শুধু নয়, দরকার সততার সঙ্গে তাঁর জীবনের সব অধ্যায় মূল্যায়ন করা। একদিকে বীরত্ব, অন্যদিকে বিতর্ক; এই দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে থাকে তাঁর জীবনের উপাখ্যান।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, বাংলা অ্যাফেয়ার্স
খবরওয়ালা/এমএজেড