খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মহারাষ্ট্রের নাগপুরে এক ৯০ বছর বয়সী বৃদ্ধের নামে ১০০ বছর মেয়াদি জীবনবিমা পলিসি ইস্যুর অভিযোগ ঘিরে রাষ্ট্রায়ত্ত এক ব্যাঙ্কের শাখা ব্যবস্থাপককে নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি সামনে আসতেই গ্রাহক সুরক্ষা, ‘মিস-সেলিং’ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শাখার দীর্ঘদিনের এক প্রবীণ গ্রাহকের নামে এমন একটি জীবনবিমা পরিকল্পনা করা হয়, যার ম্যাচিউরিটি তারিখ ২১২৪ সাল—অর্থাৎ পলিসিধারীর বয়স ১৯০ বছর পূর্ণ হলে! বার্ষিক প্রিমিয়াম ধার্য করা হয় ২ লক্ষ টাকা। গত দুই বছরে মোট ৪ লক্ষ টাকা কেটে নেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তৃতীয় কিস্তির নোটিফিকেশন আসার পর পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারেন।
পরিবারের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপক পূর্বপরিচয়ের সুযোগ নিয়ে প্রবীণ গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেন এবং ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয়’ বলে পলিসিটি গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করেন। শারীরিকভাবে দুর্বল ওই বৃদ্ধ নিজে নথিপত্র পূরণ করতে অক্ষম হওয়ায় ব্যাঙ্কের কর্মীরাই ফর্ম পূরণ করেন। এতে স্বচ্ছতা, সম্মতি এবং যথাযথ যাচাই (ডিউ ডিলিজেন্স) নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| গ্রাহকের বয়স | ৯০ বছর |
| পলিসির মেয়াদ | ১০০ বছর (ম্যাচিউরিটি ২১২৪) |
| বার্ষিক প্রিমিয়াম | ২,০০,০০০ টাকা |
| পরিশোধিত প্রিমিয়াম | ৪,০০,০০০ টাকা (দুই বছরে) |
| অভিযোগ | মিস-সেলিং ও প্রভাবিত সম্মতি |
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নেটিজেনদের একাংশ একে ‘প্রিডেটরি সেলস প্র্যাকটিস’ আখ্যা দেন। চাপের মুখে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এবং কাটা প্রিমিয়ামের অর্থ গ্রাহকের হিসাবে ফেরত দেওয়া হয় বলে জানা যায়। তবে অর্থ ফেরত এলেও বৃহত্তর প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই ঘটনা কি কেবল বিচ্ছিন্ন, নাকি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার অংশ?
ভারতের বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা Insurance Regulatory and Development Authority of India (আইআরডিএআই)–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘মিস-সেলিং’ সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা আড়াই লক্ষেরও বেশি, যার প্রায় অর্ধেক জীবনবিমা পণ্যকে ঘিরে। অভিযোগের এই ঊর্ধ্বগতি ইঙ্গিত দেয় যে সমস্যাটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত।
অন্যদিকে, Reserve Bank of India–এর প্রস্তাবিত গ্রাহক সুরক্ষা কাঠামোতে ৬০ বছরের বেশি বয়সী গ্রাহকের ক্ষেত্রে বিমা বা জটিল আর্থিক পণ্য বিক্রির সময় অতিরিক্ত সতর্কতা, ‘রেড-ফ্ল্যাগ’ পর্যালোচনা এবং বহুস্তরীয় যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন উচ্চঝুঁকির পলিসি অনুমোদনের আগে গ্রাহকের প্রোফাইল, আয়, আর্থিক লক্ষ্য এবং স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত ছিল।
এ ঘটনায় আরও প্রশ্ন উঠছে—কেওয়াইসি ও অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থার একাধিক ধাপ পেরিয়ে এমন পলিসি অনুমোদিত হলো কীভাবে? ১০০ বছর পরের ম্যাচিউরিটি তারিখ দেখে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সতর্ক হলো না কেন? সেলস টার্গেট পূরণের চাপ কি মানবিকতা ও নীতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহক সুরক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কবার্তা, বয়স্ক গ্রাহকদের জন্য বাধ্যতামূলক ‘কুলিং-অফ’ পিরিয়ড এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের ভেরিফিকেশন চালু না করলে এ ধরনের ঘটনা থামানো কঠিন। নাগপুরের এই ঘটনা তাই কেবল একটি শাখার বিতর্ক নয়; এটি আর্থিক খাতে আস্থার ভিত্তি কতটা নড়বড়ে, তারও একটি সতর্ক সংকেত।