চাঁপাইনবাবগঞ্জে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে বাস, ট্রাক, ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল থেকে একটি শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা কর্মবিরতি শুরু করলে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটে যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী, পণ্য পরিবহনকারী এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মূল বিরোধের সূত্রপাত যানবাহন থেকে শ্রমিক কল্যাণের নামে চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন এবং জেলা ট্রাক, ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নিজেদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন যানবাহন থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করে আসছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মীদের বিরুদ্ধে এক বাস শ্রমিককে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার পর সেদিন রাতে প্রায় এক ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ ছিল। পরে শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাতেই বাস চলাচল শুরু হয়।
বিরোধ মেটাতে বুধবার রাতে পুলিশের তত্ত্বাবধানে দুই শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি। দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আলোচনার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব হয়নি। এর পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জেলা ট্রাক, ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা কর্মবিরতি শুরু করেন।
কর্মবিরতির কারণে শুধু পণ্যবাহী যান নয়, জেলার বিভিন্ন রুটে বাস চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী সড়কের বিভিন্ন স্থানে ট্রাক ও বাস রাস্তার পাশে থামিয়ে রাখায় যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
রাজশাহী যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়া যাত্রী জাহিদ হাসান বলেন, বাসস্ট্যান্ডে এসে তিনি জানতে পারেন বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে বিকল্প যানবাহনের খোঁজ করতে গিয়ে তিনি অতিরিক্ত ভাড়ার মুখে পড়েন। তাঁর অভিযোগ, শ্রমিক সংগঠনগুলোর নিজেদের বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
জেলা ট্রাক, ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাইদুর রহমান অভিযোগ করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে সড়কে বাস আটকে শ্রমিক কল্যাণের নামে বেআইনিভাবে চাঁদা আদায় করছে। এর প্রতিবাদেই শ্রমিকরা কর্মবিরতিতে গেছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ জুলমত। তাঁর দাবি, তাঁদের সংগঠন নিয়ম মেনেই বাস থেকে চাঁদা আদায় করছে। বরং ট্রাক, ট্যাংকলরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা নিজেদের যানবাহনের পাশাপাশি বাস থেকেও চাঁদা আদায় করছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, বাস থেকে চাঁদা নেওয়ার অনুমতি ওই সংগঠনের নেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, দুই সংগঠনের বিরোধ নিরসনে পুলিশ উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেছে। তবে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে সমঝোতা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সড়কে কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সুযোগ নেই—এ বিষয়ে উভয় শ্রমিক সংগঠনকেই সতর্ক করা হয়েছে। বিরোধ দ্রুত মীমাংসা করে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কারণে জেলার পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রীদের পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব স্থানীয় বাজার ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা রয়েছে।

