গাজীপুরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করণী ফ্যাশনস

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সালিপুর এলাকার রতনপুরে অবস্থিত করণী ফ্যাশনস লিমিটেডের একটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। শনিবার থেকে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। কারখানাটিতে প্রায় আট হাজার শ্রমিক কর্মরত থাকায় এই সিদ্ধান্তে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও জীবিকায় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে।

পুলিশ, শ্রমিক এবং কারখানা-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটিতে শ্রমিক অসন্তোষ চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার কারখানা কর্তৃপক্ষ একটি নোটিশ জারি করে জানায়, পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় কারখানার গার্মেন্টস শাখার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হচ্ছে। নোটিশ অনুযায়ী শনিবার থেকে সিদ্ধান্তটি কার্যকর হয়েছে।

করণী ফ্যাশনস লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজবাউর রহমান খান বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে শ্রম আইন অনুযায়ী সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে সমস্যার সমাধান হলে এবং পরিবেশ স্বাভাবিক হলে কারখানাটি পুনরায় চালু করা হবে।

কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ৮ জুলাই বিকেল থেকে গার্মেন্টস শাখার শ্রমিকেরা আকস্মিকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। পরদিন সকালে তাঁরা কারখানায় উপস্থিত হলেও কাজে যোগ দেননি। কর্তৃপক্ষ একাধিকবার শ্রমিকদের উৎপাদনে ফিরতে অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া মেলেনি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী ১১ জুলাই থেকে গার্মেন্টস শাখার কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্যদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, কয়েক মাস ধরে নির্ধারিত সময় ও এককালীন বেতন পরিশোধ না করে কিস্তিতে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাড়িভাড়া, বাজার-সদাই, সন্তানের লেখাপড়া এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে তাঁরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বারবার এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় ক্ষোভ থেকে তাঁরা উৎপাদন বন্ধ রাখেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর শাখার সভাপতি শফিউল আলম শ্রমিকদের অভিযোগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের বকেয়া ও প্রাপ্য অর্থ যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি। এসব দাবি নিয়ে শ্রমিকেরা প্রতিবাদ জানালে আলোচনার পরিবর্তে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

এদিকে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, কারখানা বন্ধ ঘোষণার পর এলাকায় কোনো অপ্রীতিকর বা সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে।

সম্প্রতি গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে একের পর এক পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঘটনা শ্রম খাতে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর আগে ১ জুলাই গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী এলাকার ইসলাম গার্মেন্টস লিমিটেড (ইউনিট-২)-এর কার্যক্রমও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। একই দিনে বাঘেরবাজার এলাকায় লিথী গ্রুপের পাঁচটি পোশাক কারখানাও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন।

দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এবং এ খাতে কয়েক মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের মজুরি, বকেয়া পরিশোধ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কারখানা বন্ধের মতো ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের নয়, সামগ্রিক শিল্পখাতের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, সময়মতো বেতন পরিশোধ এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের সংকট অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।