খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
খুলনায় এক অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীকে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সোনাডাঙ্গা থানার উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) পপি রানী সাহা এবং তাঁর স্বামী সঞ্জয় কুমার সরকারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) সকালে ভুক্তভোগী গৃহকর্মীর মা মিনতী রানী বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করার পর এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ দম্পতিকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার দ্বিতীয় ফেজের ৬ নম্বর রোডের ৪১৯ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে সপরিবারে ভাড়া থাকেন এএসআই পপি রানী সাহা ও সঞ্জয় কুমার সরকার দম্পতি। তাঁদের নিজেদের সন্তান দেখাশোনা এবং গৃহস্থালির কাজের সহায়তার জন্য এএসআই পপির গ্রামের বাড়ি থেকে মিলন দাশ নামের একটি মেয়েকে খুলনায় আনা হয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে মিলন দাশ নামের ওই মেয়েটি এই পুলিশ দম্পতির বাসাতেই গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাঁচ বছর ধরে সেখানে অবস্থান করলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর ওপর মাঝেমধ্যেই নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগে প্রকাশ পায়।
গত বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে ওই বাসায় রান্না করার সময় অসাবধানতাবশত চুলার ওপর থাকা কড়াইয়ে হঠাৎ আগুন ধরে যায় এবং কড়াইয়ে থাকা তরকারি পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। রান্না নষ্ট হওয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গৃহকর্ত্রী ও এএসআই পপি রানী সাহা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি রাগের মাথায় চুলা থেকে গরম ও পোড়া কড়াই এনে গৃহকর্মী মিলন দাশের শরীরের বিভিন্ন অংশে চেপে ধরে নির্মমভাবে ছ্যাঁকা দেন। গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকায় মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন স্থান পুড়ে যায়। এর পাশাপাশি মিলন দাশকে নির্বিচারে চড়, থাপ্পড় মারা হয় এবং অসংখ্যবার কান ধরে ওঠবস করতে বাধ্য করা হয়।
বাসার খোলা জানালা দিয়ে এই নির্যাতনের নির্মম দৃশ্যটি বাইরে থেকে স্থানীয় কয়েকজন সংবাদকর্মী এবং নারী নেত্রী সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। মেয়েটির অবস্থা বেগতিক দেখে এবং নির্যাতন বন্ধ করতে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন। ৯৯ সভাপতি বা কর্মকর্তাদের নির্দেশে সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় গৃহকর্মী মিলন দাশকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর পুলিশ তাকে চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করে।
এই নির্মম গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় গতকাল ও আজ দফায় দফায় তদন্তের পর মিলনের মা মিনতী রানী বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেন। মামলার পর থানা পুলিশ কালক্ষেপণ না করে অভিযুক্ত এএসআই পপি রানী সাহা এবং তাঁর স্বামী সঞ্জয় কুমার সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে গ্রেপ্তারকৃত পুলিশ দম্পতিকে কড়া পুলিশি পাহারায় খুলনার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মামলার নথিপত্র এবং প্রাথমিক প্রমাণ বিবেচনা করে আসামিদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন।
খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (সোনাডাঙ্গা জোন) মো. হুমায়ুন কবির পুরো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত বুধবার দুপুরে জাতীয় জরুরি সেবার মাধ্যমে তথ্য পেয়ে গৃহকর্মীকে উদ্ধার করে ওসিসিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। পুলিশ দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা রুজু হওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে যে, আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে অভিযুক্ত দুজনকেই সরকারি চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী চূড়ান্ত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।