খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের শিল্প খাত নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে আগামী বছর থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে কয়েকশ শিল্পকারখানা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে। অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধও হয়ে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
শিল্পাঞ্চলগুলোতে ইতোমধ্যেই গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গাজীপুর, আশুলিয়া, টাঙ্গাইল, চন্দ্রা, রাজেন্দ্রপুর, ধনুয়া ও কোনাবাড়িসহ দেশের প্রধান শিল্পবেল্টে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না। কোথাও কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার কোনো কোনো কারখানাকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম সময় চালাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকাতেও রান্নার গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে অনেক পরিবার দৈনন্দিন কাজেও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানিয়েছেন, প্রতিদিনই গ্যাসের চাপ কমছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক গ্রাহক—সবাই আরও বড় সংকটে পড়বেন। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রায় ৭ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পর শিল্পাঞ্চলে সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে উৎপাদন কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় এবং অনেক কারখানাকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার কিংবা উৎপাদন সীমিত করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ১০৩ কোটি ২৩ লাখ ঘনফুটই আসছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে। অর্থাৎ মোট সরবরাহের একটি বড় অংশ এখন আমদানিনির্ভর, যা আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
শুধু তিতাস গ্যাসের আওতাতেই শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্যাস সংযোগ রয়েছে সাড়ে চার হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এর মধ্যেই কয়েকশ কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন সংকটে পড়েছে।
এদিকে নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও গ্যাসের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিমান্ড নোটের অর্থ জমা দেওয়ার পরও প্রায় ৫৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০টি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন নিষ্পত্তি হয়নি। এই প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সংযোগ দিতে অতিরিক্ত ৪০ কোটি ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস প্রয়োজন হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে প্রতি বছরই উৎপাদন কমছে। বিপরীতে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নগরায়ণের কারণে গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের জুন নাগাদ মোট সরবরাহ নেমে আসবে প্রায় ২৬০ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে। ২০২৮ সালে তা আরও কমে দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫৭ কোটি ঘনফুটে। অথচ ওই সময় দেশের সম্ভাব্য চাহিদা ৫০০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও ২০২৮ সালের শেষে তা কমে প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে বলে সরকারি পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে, যার মাধ্যমে দৈনিক অতিরিক্ত প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। একই সময়ে ভোলাসহ বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২১ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ভোলার গ্যাস দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সরবরাহের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে, তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
পেট্রোবাংলা আরও জানিয়েছে, বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খননের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও অতীত অভিজ্ঞতা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। গত চার বছরে ২০টির বেশি কূপ খনন করেও সংস্থাটি দৈনিক ৫ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি।
সমুদ্রে নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও সেই প্রক্রিয়ার ফল পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। দরপত্র, বিনিয়োগকারী নির্বাচন, চুক্তি, অনুসন্ধান এবং উৎপাদন—সব মিলিয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট নিরসনে এর প্রভাব পড়বে না।
দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় কয়েক বছর আগে যেখানে দৈনিক প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো, বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭৪ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুটে নেমেছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা ৫৪ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট থেকে কমে ৩২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। হবিগঞ্জে ২২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট থেকে কমে ১০ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, বাখরাবাদে ৪ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৯৪ লাখ, মৌলভীবাজারে ৪ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৯ লাখ এবং বাংগুরা গ্যাসক্ষেত্রে ১০ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট উৎপাদন হচ্ছে। সিলেট গ্যাসক্ষেত্রেও উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন কূপ খনন, দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আমদানিনির্ভরতার সঙ্গে দেশীয় উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষা—এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে শিল্প খাতের সংকট আরও গভীর হতে পারে। এর প্রভাব শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা দিতে পারে।