খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫
আট বছর পার হলেও চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার দিকেই এগোচ্ছে। কাজ অর্ধেক শেষ করে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে উড়ালসড়কটি উদ্বোধন করা হয়। এখনো কাজ চলমান, আর ভবিষ্যতে সড়কটির যথাযথ ব্যবহার ও সুফল নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
উড়ালসড়কটি লালখান বাজার থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মূল সড়ক থেকে সেতুতে ওঠার পথ রাখা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্সপ্রেসওয়েতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, সেই অর্থ দিয়ে পুরো চট্টগ্রাম নগরীর সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও ব্যবহারবান্ধব করে তোলা যেত; যার সুফল পুরো নগরবাসী পেত।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে আরও ব্যবহারোপযোগী করতে হলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে। তবে তাতেও পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাবে না। শুধু র্যাম্প থাকলেই ব্যবহার বাড়বে না, ঢাকায়ও র্যাম্প দিয়ে প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। এজন্য কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন— মন্তব্য নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়ার।
এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)ও আশার কথা শোনাতে পারছে না। সিডিএ জানায়, প্রকল্প শুরুর পর চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়ের আপত্তি, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ট্রাফিক বিভাগের অনুমতি না পাওয়া, লালখান বাজার অংশের নকশা নিয়ে আপত্তি, কোভিডকালে কাজ ধীরগতি, বিকল্প সড়ক চালুতে জটিলতা এবং বন্দরসংলগ্ন এলাকায় নকশা পরিবর্তন— এসব কারণে প্রকল্পে দেরি হয়। সমীক্ষা অনুযায়ী ১০টি র্যাম্প ছাড়াও আরও র্যাম্প প্রয়োজন হবে, যা প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়াবে।
প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, লালখান বাজার–পতেঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ১০টি র্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে আগ্রাবাদ জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের সামনে নামার র্যাম্প এবং আগ্রাবাদ ডেবার পাড়ে ওঠার র্যাম্প— এই দুটির কাজ এখনো শুরু হয়নি।
চারটি র্যাম্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পতেঙ্গা থেকে লালখান বাজারমুখী নিমতলা মোড়ে ওঠা–নামার দুটি, টাইগারপাসে আমবাগানমুখী নামার একটি এবং লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গামুখী ফকিরহাটে নামার একটি র্যাম্পের কাজ শেষ হলেও এগুলো দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়নি।
বাকি চারটির কাজ এখনো চলছে— চট্টগ্রাম ইপিজেডের সামনে দুটি ওঠা–নামার র্যাম্প, কর্ণফুলী ইপিজেডের সামনে একটি ওঠার র্যাম্প এবং জিইসি মোড়ে পতেঙ্গামুখী একটি র্যাম্প।
চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শুধু লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা যাওয়ার জন্য নয়, বরং পুরো নগরের যানজট কমানোর জন্য করা হয়েছে। নকশা অনুযায়ী র্যাম্প না থাকলে মানুষ সুফল পাবে না এবং প্রত্যাশামতো গাড়ি চলাচল করবে না।
২০১৭ সালের আগস্টে একনেক সভায় অনুমোদিত ১৫.৫ কিলোমিটার এই প্রকল্পের ব্যয় প্রথমে ধরা হয়েছিল ৩,২৫০ কোটি টাকা, মেয়াদ তিন বছর। পরে দুই দফায় বাড়িয়ে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪,৩১৫ কোটি টাকা। তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক্সপ্রেসওয়েটির উদ্বোধন করেন।
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহ-সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ সুভাষ বড়ুয়া গণমাধ্যমকে বলেন, কম খরচ দেখিয়ে প্রকল্প অনুমোদন নেওয়ার জন্য একটি ফরমায়েশি ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছিল। অভিজ্ঞ কনসাল্টিং প্রতিষ্ঠান দিয়ে করলে তা আরও কার্যকর হতো। কোটি টাকা খরচ করে ৮০ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়, যা যথাযথ নয়।
তিনি বলেন, এক্সপ্রেসওয়েতে অধিকতর ব্যবহার নিশ্চিত করতে আরও অর্থ ব্যয় করতে হবে, তবুও পূর্ণ সুফল নাও আসতে পারে। শুধু র্যাম্প দিয়ে সমাধান নয়; কার্যকর ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে যে ব্যয় ধরা হয়েছে তাতে পুরো কাজ শেষ হবে না, বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নয়টি র্যাম্প সম্পন্ন করে প্রথম ধাপ শেষ করা হবে। এরপর কোথায় আরও র্যাম্প প্রয়োজন তা কনসালট্যান্টের মাধ্যমে নির্ধারণ করে সিডিএ নিজস্ব অর্থায়নে দ্বিতীয় ধাপে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দ্বিতীয় ধাপ কবে হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ফ্লাইওভারটি মূলত বিমানবন্দরে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করতে করা হয়েছে এবং নগরবাসী ইতোমধ্যে এর কিছু সুফল পাচ্ছে। মামলা, জমি জটিলতা ও জনঅসন্তোষের কারণে কিছু র্যাম্পের কাজ পিছিয়েছে, তবে বাকি কাজ পাঁচ–ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২৫ সালে দৈনিক গড়ে ৬৬,৩২৩টি গাড়ি এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করার কথা থাকলেও বর্তমানে চলাচল করছে প্রতিদিন সাত হাজারেরও কম। সব র্যাম্প চালু হলে প্রকৃত ব্যবহার বোঝা যাবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, লালখান বাজার র্যাম্পের মাঝখানে প্লাস্টিক ডিভাইডার বসিয়ে সরু পথে যানবাহন উঠছে। পুরো এক্সপ্রেসওয়ে প্রায় ফাঁকা, কয়েকটি প্রাইভেট কার, জিপ ও সিএনজি ছাড়া তেমন কোন যান নেই; বাস চলাচলও নেই।
খবরওয়ালা/টিএসএন