বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১ই আগস্ট ২০২৬, ৩:২৫ পিএম
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় সংঘটিত হামলা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে পুলিশের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি হিসেবে আলোচিত। ওই ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। হামলায় বেঁচে ফেরা পুলিশ সদস্যদের বর্ণনা, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য এবং তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য মিলিয়ে উঠে এসেছে সেদিনের ভয়াবহ চিত্র। ঘটনার এক বছর পরও মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও হামলার নানা দিক এবং দায় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা পুলিশ উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল মালেক জানান, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে তিনি হামলার মধ্যেই ছোট ভাইকে ফোন করে জীবনের শেষ বিদায় জানিয়ে দেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, থানা চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে যাওয়ার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে জীবিত ফিরে আসার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাই পরিবারের সদস্যদের সন্তানদের দেখাশোনার অনুরোধ জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় এনায়েতপুর থানায় মোট ৫৭ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন নারী কনস্টেবলও ছিলেন। হামলার সময় থানায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে অনেক পুলিশ সদস্য প্রাণ বাঁচাতে পেছনের দিক দিয়ে পালিয়ে আশপাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে আশ্রয় নেওয়া পুলিশ সদস্যদের খুঁজে বের করে মারধর করা হয়। আহত অবস্থায় অনেককে ফেলে রাখা হলেও ১৫ জন পুলিশ সদস্য শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান। ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুজনের মৃত্যু হয়। নিহতদের একজনের মরদেহ থানার পাশের একটি বাজারে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, হামলার আগে সকালে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে থানার সামনে আসে। প্রথম দফায় পুলিশের অনুরোধে তারা সরে গেলেও দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে আবার বিপুল সংখ্যক মানুষ থানা ঘিরে ফেলে। এরপর শুরু হয় সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। ওই দিন সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তবে বেঁচে ফেরা পুলিশ সদস্যদের দাবি, তারা প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করেননি; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত থানা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
এসআই আব্দুল মালেকের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার এক পর্যায়ে থানার পানির ট্যাংকের নিচে ওসি (তদন্ত)সহ চারজন পুলিশ সদস্য লুকিয়ে ছিলেন। পরে সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি আরও জানান, ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ছিল যে ৬ আগস্ট তাদের কয়েকজনকে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠানো হয় লাশবাহী গাড়িতে, কাফনের কাপড়ে মুড়িয়ে, যাতে পথে কেউ চিনতে না পারে।
হামলার সময় থানার অস্ত্রাগার থেকেও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। থানার তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৮টি রাইফেল, পিস্তল ও শটগান লুট হয়েছিল। এর মধ্যে এখনও ছয়টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। পাশাপাশি অধিকাংশ গুলিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার পর ২৬ আগস্ট এনায়েতপুর থানায় পুলিশ হত্যার ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের চারজন নেতার নাম উল্লেখ করে আরও পাঁচ থেকে ছয় হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। মামলার প্রধান আসামি ছিলেন এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চু, যিনি পরে কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান। এই মামলায় সিরাজগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসসহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় মোট চারটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পুলিশ সদস্যদের হত্যার এবং বাকি তিনটি আন্দোলনকারীদের মৃত্যুর ঘটনায়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান জানান, পুলিশ হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, তদন্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ হত্যা মামলার বাদী হিসেবে এসআই আব্দুল মালেকের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় তিনি শুধু যেখানে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল, সেখানে স্বাক্ষর করেছিলেন। তার দাবি, এজাহারের মূল বিবরণ তিনি নিজে লেখেননি। অন্যদিকে, সে সময় দায়িত্বে থাকা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তৎকালীন সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে চাপের মধ্যেই মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
এনায়েতপুর থানা হামলা শুধু প্রাণহানির জন্য নয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এক বছর পেরিয়ে গেলেও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হয়নি। ফলে হামলার পরিকল্পনা, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী এবং দায় নির্ধারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখনও তদন্তের অগ্রগতির দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য