খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে চরম সংকটে নিমজ্জিত পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের একটি বিশেষ সভায় এই নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় দেশের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিন ধরে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা মোট নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র অনুযায়ী, বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীর মোট ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আমানত গচ্ছিত রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই অবসায়ন বা বন্ধকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রথম ধাপে প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত বা ভেঙে দেওয়া হবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রশাসক নিয়োগ করা হবে, যিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও প্রকৃত দায়-দেনা মূল্যায়ন করে আমানতকারীদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত বছরগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম, সুশাসনের চরম অভাব এবং বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। বিশেষ করে, বহুল আলোচিত পি কে হালদারের বিরুদ্ধে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি) থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, তীব্র তারল্য সংকট এবং গ্রাহকদের আমানত সময়মতো ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে গত বছরের মে মাসে ২০টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের জমা দেওয়া পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে নয়টি প্রতিষ্ঠানকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার ধারাবাহিকতায় এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিচে বন্ধের তালিকায় থাকা পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম এবং গত ডিসেম্বর মাস শেষে তাদের খেলাপি ঋণের সর্বশেষ চিত্র বিস্তারিত ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক সংখ্যা | আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম | খেলাপি ঋণের হার (শতকরা) |
| ১ | এফএএস ফাইন্যান্স | ৯৯.৯৯% |
| ২ | ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস | ৯৯.৪৪% |
| ৩ | ফারইস্ট ফাইন্যান্স | ৯৮.৫০% |
| ৪ | পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস | প্রায় ৯৫.০০% |
| ৫ | আভিভা ফাইন্যান্স | ৯৩.৯৩% |
অপরদিকে, একই সভায় সংকটে থাকা অবশিষ্ট চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের আর্থিক অবস্থা সচল ও পুনরুদ্ধার করার জন্য শেষ সুযোগ হিসেবে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, এই নির্ধারিত তিন মাস সময়ের মধ্যে যদি তারা সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার ন্যূনতম সক্ষমতা প্রদর্শন করতে না পারে, তবে এই চার প্রতিষ্ঠানকেও একই নিয়মে অবসায়ন বা বন্ধকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় নিয়ে আসা হবে।