খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ১:২৫ পিএম
বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন আরও ভয়ানক রূপ নিচ্ছে। চলতি ২০২৬ বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) সারা দেশে ২০২৫ জন নারী ও শিশু ভয়াবহ ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। আজ বুধবার (১৫ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে গত ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল ১ হাজার ৪২ জন।
বিগত ছয় মাসে সারা দেশে ৪০৪ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৩৮ জনই অবুঝ শিশু ও কিশোরী। ধর্ষণের এই নৃশংসতা এখানেই থেমে থাকেনি; পাশবিকতার পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে। এছাড়া একই সময়ে ৮৮ জন নারী ও শিশুকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে আরও ৪৭৬ জনকে।
যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির কারণেও নারীদের জীবন দিতে হচ্ছে। গত ছয় মাসে যৌতুকের লোভী থাবায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন নারী, আহত হয়েছেন ৮ জন এবং লোকলজ্জা ও যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা পথ বেছে নিয়েছেন ৩ জন। অন্যদিকে পারিবারিক সহিংসতার চিত্রটিও অত্যন্ত করুণ। এই সময়ে পারিবারিক কলহ ও নির্যাতনের জেরে ৩২০ জন নারী নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২১১ জন এবং বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন আরও ১৪৭ জন নারী। এছাড়া এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ৪ জন নারী।
অসহায় শিশুদের ওপর সহিংসতার চিত্রটি আরও শিউরে ওঠার মতো। বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে ১ হাজার ৭৭ জন শিশু চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৩০৫ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এছাড়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে আরও ৭৭২ জন শিশু। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এই সংখ্যাটি ছিল ৬৭৩ জন, যার মধ্যে মারা গিয়েছিল ১৩২ জন শিশু।
দেশের মূলধারার ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, এইচআরএসএসের নিজস্ব সংগৃহীত তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই সংকলনটি তৈরি করা হয়েছে।
নিচে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের নারী ও শিশু নির্যাতনের বিস্তারিত পরিসংখ্যানের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | নির্যাতনের বিবরণ (জানুয়ারি – জুন ২০২৬) | আক্রান্ত/নিহত/আহতের সংখ্যা | ২০২৫ সালের একই সময়ের চিত্র |
| ১ | মোট ধর্ষণের শিকার (নারী ও শিশু) | ৪০৪ জন | – |
| ২ | ধর্ষণের শিকার শিশু ও কিশোরী | ২৩৮ জন | – |
| ৩ | ধর্ষণের পর হত্যার শিকার | ১৭ জন | – |
| ৪ | সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার | ৮৮ জন | – |
| ৫ | যৌন নিপীড়নের শিকার (নারী ও শিশু) | ৪৭৬ জন | – |
| ৬ | মোট নির্যাতিত নারী ও কন্যাশিশু | ১,৬২১ জন | ১,০৪২ জন |
| ৭ | পারিবারিক সহিংসতায় নিহত নারী | ৩২০ জন | – |
| ৮ | পারিবারিক সহিংসতায় আহত নারী | ২১১ জন | – |
| ৯ | পারিবারিক সহিংসতায় আত্মহত্যা | ১৪৭ জন | – |
| ১০ | যৌতুকের কারণে নিহত নারী | ১৯ জন | – |
| ১১ | এসিড সহিংসতায় আহত নারী | ৪ জন | – |
| ১২ | মোট নির্যাতনের শিকার শিশু | ১,০৭৭ জন | ৬৭৩ জন |
| ১৩ | নির্যাতিত শিশুদের মধ্যে মৃত | ৩০৫ জন | ১৩২ জন |
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, দেশে আইনের শাসনের অভাব এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই নারীদের ওপর এই পাশবিকতা বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মব সহিংসতার পাশাপাশি যদি নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর স্থায়ী সমাধান না করা যায়, তবে দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অন্ধকারের দিকে যাবে। এই অবক্ষয় রুখতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সুশীল সমাজকে একসাথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
মন্তব্য