খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশজুড়ে এখনো থেমে থেমে বৃষ্টিপাত চলছে। এমন অবস্থায় চলতি সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত বছর ২০২৩ সালে মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং মোট মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশই ছিল সেপ্টেম্বরে। যদিও গত বছর সর্বোচ্চ আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছিল অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে এবং নভেম্বরে শনাক্তের হার ছিল শীর্ষে। চলতি বছরে অবশ্য জুলাই ও আগস্টে সর্বোচ্চ আক্রান্ত দেখা গেছে, এবং সেপ্টেম্বরেও সেই একই ধারা অব্যাহত আছে। গত সাত দিনে প্রায় ৩ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসজুড়ে ডেঙ্গুর উচ্চ সংক্রমণ বজায় থাকবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, চলতি মাসে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা আগস্টের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশা দ্বারা বাহিত ডেঙ্গু জ্বর এখন বছরব্যাপী একটি সমস্যা। তবে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরকে সংক্রমণের পিক সিজন ধরা হয়। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ সময় থেমে থেমে বৃষ্টিপাত এবং জমে থাকা পানি থেকে মশার বংশবিস্তার বেড়ে যাওয়ায় রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে রোগের প্রকোপ কমতে শুরু করে। তবে গত বছরের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসেও সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি বিদ্যমান ছিল। তাই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে, জমে থাকা পানি তিন দিনের বেশি রাখতে দেওয়া যাবে না এবং রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে কোনো অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর বিস্তার মারাত্মকভাবে বাড়ছে। মৌসুমি বায়ুর কারণে এই মাসে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হয়, যা জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। গত বছর অক্টোবর ও নভেম্বরেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি মারাত্মক ছিল। এ বছরও সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী তিন মাস ডেঙ্গুর বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই জরুরিভিত্তিতে মশক নিধন এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।’
দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। অন্যান্য বছরগুলোতে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১১ জন, ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন, ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন, করোনাকালীন ২০২০ সালে ১ হাজার ৪০৫ জন এবং ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। সেই হিসাবে চলতি বছর পর্যন্ত যত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তা বছরের হিসাবে পঞ্চম সর্বোচ্চ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৪১১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও ১৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। মাসের হিসাবে চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনে ২ হাজার ৯৩৫ জন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে এবং ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ৪৯৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৯ জনের। জুলাই মাসে ১০ হাজার ৬৮৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছিল, এবং মারা গিয়েছিল ৪১ জন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ১৮ হাজার ৯৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং মৃত্যু হয়েছিল ৮০ জনের। আগস্টে রোগী শনাক্ত হয় ৬৫২১ জন, আর মৃত্যু হয় ২৭ জনের। জুলাইয়ে ভর্তি হয় ২ হাজার ৬৬৯ জন এবং মৃত্যু হয় ১২ জনের।
ডেঙ্গু সংক্রমণের সর্বশেষ চিত্র: গতকাল রোববার ডেঙ্গুতে আরও তিনজন মারা গেছেন এবং দেশজুড়ে ৫৮০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে চলতি বছরে মোট মৃত্যু ১৩৫ জনে পৌঁছেছে এবং শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪১১ জনে। গতকাল ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১২৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৯৪ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৮৫ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৮৫ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৮০ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩২ জন, রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫৫ জন, রংপুর বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) তিনজন, সিলেট বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৭ জন রয়েছেন। এছাড়াও, গতকাল ৫৫২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ৩২ হাজার ৭০৫ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। মোট শনাক্ত রোগীর মধ্যে ৬৬.৬% পুরুষ এবং ৩৩.৪% নারী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন ডেঙ্গু শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ৩৯ জনের মৃত্যু হয়। বছরের অন্যান্য মাসগুলোতে রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল: জানুয়ারিতে ১,১৬১, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪, মার্চে ৩৩৬, এপ্রিলে ৭০১, মে মাসে ১,৭৭৩, এবং জুনে ৫,৯৫১ জন। এই সময়গুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল: জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, এপ্রিলে ৭ জন, মে মাসে ৩ জন, এবং জুনে ১৯ জন।
খবরওয়ালা/টিএসএন