চাঁদার টাকায় পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধুনিক অস্ত্রের মওজুদ

পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র ও বড় ব্যবসা থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ—সর্বত্রই সশস্ত্র আঞ্চলিক দলগুলোর ব্যাপক চাঁদাবাজির অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, আদা, হলুদ কিংবা বনজ সম্পদ বাজারে নিতে যেমন ধাপে ধাপে টাকা দিতে হয়, তেমনি ঘরবাড়ি নির্মাণ, গবাদি পশু কেনাবেচা এবং নতুন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রেও জোরপূর্বক অর্থ আদায় করছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির বাইরে পরিচালিত এই বাধ্যতামূলক আদায় স্থানীয় জনগণের ওপর এক চরম আর্থিক ও মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু নিয়মিত চাঁদাবাজিই নয়, অপহরণ করে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় করা হচ্ছে ভারী ও আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয়ে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পাহাড়ে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে অর্থ দিতে বাধ্য থাকায় কৃষক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে এর প্রত্যক্ষ বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পাহাড়ে এই অবৈধ চাঁদাবাজির বার্ষিক পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অন্যদিকে পর্যটক, উন্নয়নকাজের ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের কারণে পার্বত্য অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সার্বিক উন্নয়নমূলক কাজ মারাত্মকভাবে থমকে যাচ্ছে।

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই অর্থবল ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এমআইএসটি ও সাভার এআইবিএর অ্যাডজাঙ্কট প্রফেসর মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জানান, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির লক্ষ্য ছিল সংঘাতের অবসান ঘটানো, কিন্তু দীর্ঘ দিন পরও অস্ত্রধারণ, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, সামরিক ক্যাম্প প্রত্যাহারে দুর্গম এলাকায় রাষ্ট্রের সরাসরি উপস্থিতি হ্রাস পাওয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংগঠিত হওয়া, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং অস্ত্র ও রসদ পরিবহন সহজতর হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও ওপার থেকে আনুকূল্য পাওয়ার অভিযোগগুলোও জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে নিরপেক্ষ তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের দাবি রাখে।

পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, চাঁদাবাজির আধিপত্য ও টাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মূলত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী বিরোধ তৈরি হয়। তবে অস্ত্রের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে রাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার চিন্তা চরম বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকারি বাহিনীর শক্তির সমকক্ষ হওয়া তাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক ও শান্তিময় জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানান।

পাহাড়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সশস্ত্র ক্যাডারদের গ্রেপ্তার করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ও অর্থের মূল উৎস ভেঙে দেওয়া জরুরি। এজন্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং এনজিও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ কমিটিতে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাব উঠেছে। পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকাতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অর্থ লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি এবং অস্ত্র সরবরাহকারীদের নেটওয়ার্ক উচ্ছেদ করা প্রয়োজন।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা দাউদ আলম। তিনি জানান, পাহাড়ে সন্তু লারমা ও প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন দুটি প্রধান গ্রুপ এখনো পূর্ণদমে তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ ও চাঁদাবাজির কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব শীর্ষ নেতাদের পরিবার ও সন্তানরা প্রতিবেশী দেশের সীমান্তবর্তী শহরে বসবাস করছে। ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের চাপে যে চুক্তি হয়েছিল, তার অধীনে সামরিক ক্যাম্প তুলে নেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমেত্বের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়েছে। দাউদ আলম জরুরি ভিত্তিতে পাহাড়ে প্রত্যাহারকৃত সামরিক ক্যাম্পগুলো পুনঃস্থাপন, ১৯৯৭ সালের চুক্তি বাতিল এবং সীমান্ত সুরক্ষায় আধুনিক ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও রাডার ব্যবস্থা মোতায়েনের জোর দাবি জানান।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।