মো. শরিফুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ডিজিটাল যুগে আমরা এখন যোগাযোগে অভ্যস্ত একেবারে তাত্ক্ষণিকতার সঙ্গে। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল কিংবা এসএমএস—সবই মুহূর্তেই মানুষকে মানুষে যুক্ত করছে। দূরের মানুষকে খোঁজ নিতে এখন এক সেকেন্ডও সময় লাগে না। কিন্তু এই দ্রুততার ভিড়ে আমরা হারাচ্ছি এক অমূল্য সম্পদ—কাগজে-কলমে লেখা চিঠি। প্রতি বছরের ১ সেপ্টেম্বর পালিত বিশ্ব চিঠি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হাতে লেখা কয়েকটি বাক্যও হয়ে উঠতে পারে আজীবনের স্মৃতি।
মানুষ কবে থেকে চিঠি লেখা শুরু করেছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। প্রাচীন সভ্যতার ইটের ফলক, মিশরের প্যাপিরাস কিংবা ভারতের তালপাতার চিঠি—সবই প্রমাণ করে যে দূরের খবর জানানোর জন্য মানুষ লিখিত বার্তার উপর নির্ভর করেছে। রাজা-বাদশাহরা তাদের শাসনব্যবস্থা চালাতেন ফরমান পাঠিয়ে, দূরদেশের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যের খোঁজ নিতেন দূত মারফত প্রেরিত চিঠিতে। বাংলার ইতিহাসেও চিঠি অসংখ্য দলিল রেখে গেছে—সিরাজউদ্দৌলার যুদ্ধে লেখা বার্তা, বিপ্লবীদের গোপন নির্দেশ কিংবা প্রবাসী শ্রমিকের গ্রামের বাড়িতে পাঠানো খবর—সবই ইতিহাসের অংশ।
চিঠি শুধু তথ্য নয়, এটি সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও বাহক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্র আমাদের সামনে হাজির করে এক ভিন্ন রবীন্দ্রনাথকে—যিনি কবি নন, বরং পিতা, বন্ধু, দার্শনিক ও সাধারণ মানুষ। নজরুল ইসলামের চিঠিতে পাওয়া যায় সংগ্রামী এক যুবকের হৃদয়ের আকুলতা। জীবনানন্দ দাশের চিঠিতে ধরা পড়ে নিঃশব্দ এক বিষণ্ন কবির অন্তর্দ্বন্দ্ব। বিশ্বসাহিত্যের পাতা উল্টালেও দেখা যায়—টলস্টয়, ভিক্টর হুগো কিংবা ভার্জিনিয়া উলফের চিঠি আজও পাঠকের কাছে সমান মূল্যবান। তাই চিঠি আসলে ইতিহাস, সাহিত্য আর ব্যক্তিগত অনুভূতির অনন্য দলিল।
একসময় গ্রামের জীবনও ছিল চিঠিনির্ভর। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা বেজে উঠলে গোটা গ্রাম ছুটে আসতো। প্রেমপত্র, পরীক্ষার ফলাফল, প্রবাসী ভাইয়ের খোঁজ কিংবা চাকরির নিয়োগপত্র—সবই পৌঁছে যেত ডাকপিয়নের ঝোলায়। আজ মোবাইল ফোন এই দায়িত্ব কেড়ে নিয়েছে, তবুও যারা চিঠির জন্য দিন গুনেছেন, তারা জানেন সেই প্রতীক্ষার উত্তেজনা কতটা গভীর ছিল।
২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার লেখক রিচার্ড সিম্পকিন বিশ্ব চিঠি দিবসের সূচনা করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি বিখ্যাত ব্যক্তিদের হাতে লেখা চিঠি সংগ্রহ করতেন। তার বিশ্বাস ছিল, হাতে লেখা চিঠি শুধু তথ্য নয়, মানুষের ব্যক্তিত্ব ও আবেগের প্রতিফলন। তাই তিনি চান নতুন প্রজন্ম অন্তত বছরে একদিন হলেও কাউকে হাতে লেখা একটি চিঠি দিক।
প্রশ্ন উঠতে পারে, যখন ইমেইল বা মেসেজ সেকেন্ডে পৌঁছে যায়, তখন কি হাতে লেখা চিঠি প্রয়োজন? উত্তর হলো—হ্যাঁ। কারণ চিঠি শুধু খবর দেয় না, এটি অনুভূতি পৌঁছে দেয়। হাতে লেখা অক্ষরের বাঁক, খামের ভাঁজ কিংবা পোস্টমার্কের তারিখ—সবই মনে করিয়ে দেয় সময়ের বিশেষ মুহূর্ত। মনোবিজ্ঞানীরাও বলেন, হাতে লেখা চিঠি মানসিক প্রশান্তি আনে এবং সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
আমাদের অনেকের জীবনেই এমন কিছু চিঠি আছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অমূল্য হয়ে উঠেছে। প্রবাসে থাকা বাবার আশ্বাস—“তোমাদের জন্য কষ্ট সহ্য করছি”—অথবা বন্ধুর দীর্ঘ হাতের লেখা যেখানে ভরে থাকে বন্ধুত্বের আন্তরিকতা। আমার নিজের দাদুর পাঠানো এক লাইনের চিঠি—“ভালো থেকো, আল্লাহ তোমাদের রক্ষা করুন”—আজও আমার মনে বাজে, যদিও তিনি আর নেই। হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ, মুছে যাওয়া কালি—এসব কিছুই আবেগকে মুছতে পারে না।
আজকের প্রজন্ম হয়তো জানেই না, কিভাবে চিঠি লেখা হয়। তাই কিছু স্কুলে আবার শুরু হয়েছে চিঠি লেখার প্রতিযোগিতা। শিশুরা বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে লিখছে, “তুমি কেমন আছো?”—এই সহজ বাক্যটিও তাদের কল্পনা, ভাষা আর আবেগ প্রকাশের সুন্দর অনুশীলন। চাইলে আমরাও সন্তানদের জন্মদিনে শুধু উপহার নয়, একটি ছোট চিঠি দিতে পারি। বিশ্বাস করুন, সেই চিঠি আজীবন থেকে যাবে তাদের কাছে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সহজতার পাশাপাশি যদি আমরা আবেগ হারিয়ে ফেলি, তবে মানবিকতারও ক্ষয় হবে। তাই বিশ্ব চিঠি দিবস শুধু স্মৃতিচারণ নয়, বরং এক আহ্বান—আমরা যেন অন্তত বছরে একদিন হলেও কলম ধরি প্রিয়জনের জন্য। কয়েকটি লাইনই হয়তো হয়ে উঠবে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।
চিঠি আসলে কেবল খবরের বাহক নয়, এটি শব্দের ফেরিওয়ালা। যে আমাদের হৃদয়ের ভেতর থেকে অনুভূতি তুলে আনে এবং অন্যের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়। আর এই ফেরিওয়ালা যতদিন থাকবে, ততদিন মানবিকতা অমর হয়ে থাকবে।
খবরওয়ালা/শরিফ