ছোট ফেনী নদী, এক সময়ের প্রমত্তা এবং স্থানীয় কৃষকদের জীবনের সঞ্চারক, আজ উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ও সাগরের লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে কৃষিকাজে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। নদীর পানিতে অস্বাভাবিক লবণাক্ততার কারণে ফসলের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং চরাঞ্চলের কৃষকরা গভীর হতাশার মুখে পড়েছেন।
নদীর পানি ও কৃষিতে প্রভাব
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ছোট ফেনী নদীর পানি দিয়েই তারা ধান, শীতকালীন সবজি ও অন্যান্য ফসল চাষ করেন। তবে গত কয়েক মাসে নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চারা এবং ফসল ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে মুসাপুর ক্লোজার ভেঙে যাওয়ার পর সাগরের লবণাক্ত পানি অবাধে প্রবেশ করছে। এর ফলে আগের মতো সহজে নদীর পানি ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
| উপজেলা | প্রভাবিত ফসল | লবণাক্ততার প্রভাব | বর্তমান সমস্যা |
|---|---|---|---|
| সোনাগাজী | বোরো ধান, আমন | চারা পুড়ে মারা যায় | চাষের ব্যয় বৃদ্ধি, কম ফসল |
| বালিগাঁও | শীতকালীন সবজি, তরমুজ, শসা, মরিচ | গাছ লাল হয়ে মারা যাচ্ছে | জমি অনাবাদি, খরচ বৃদ্ধি |
| দাগনভুঞা | সবজি ও ধান | লবণাক্ত পানি সেচে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত | বিকল্প নলকূপ ব্যয়বহুল, ঘাস কম |
কৃষকের কণ্ঠ
সোনাগাজীর মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, “আগে নদীর পানি দিয়ে আমন ও বোরো ধান চাষ করতাম। এখন পানি মুখে দিলে জিহ্বা জ্বলে, চারা দুই দিনের মধ্যে মারা যায়। আমাদের বাঁচার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”
ফেনী সদর উপজেলার শেখ ফরিদ আমিন উল্লেখ করেন, “বিএডিসির সেচ পাম্প ব্যবহার করেই আমরা কম খরচে পানি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করতাম। এখন নোনা পানি ও বালি জমিতে ঢোকার কারণে চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
নূর হোসেন বলেন, “নদীর ওপর নির্ভরশীল আমাদের কয়েক লাখ মানুষ। লবণাক্ততার কারণে শত শত একর জমি অনাবাদি, গবাদি পশুর খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে।”
সমাধানের প্রস্তাবনা
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
-
মুসাপুর ক্লোজার দ্রুত নির্মাণ।
-
স্লুইস গেটের আধুনিকায়ন ও সঠিক সময়ে পরিচালনা।
-
ছোট ফেনী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং।
-
লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান ও ফসলের বীজ সরবরাহ।
-
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুর ও খাল পুনঃখনন।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, “মুসাপুর ক্লোজার নির্মাণ হলে নদীভাঙন ও জোয়ার-ভাটার কারণে সৃষ্ট সমস্যা দূর হবে এবং চরাঞ্চলের কৃষক উপকৃত হবেন।”
উপকূলীয় এ অঞ্চলের কৃষি এখন ছোট ফেনী নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এ অঞ্চল মরুভূমি বা অনাবাদি জমিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ফলে কৃষি ও কৃষকের জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
এই প্রতিবেদনে নদীর লবণাক্ততা ও কৃষিকাজে এর প্রভাবকে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি জোরালো সতর্কবার্তা।