খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতকরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আট ঘণ্টাব্যাপী প্রশাসনিক ভবন অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে অবরোধ প্রত্যাহার করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালাটি ঝোলানো অবস্থায় বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
রোববার সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের একদল নারী শিক্ষার্থী নতুন প্রশাসনিক ভবনের দুটি প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে এই অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ আট ঘণ্টা পর, সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ভবনের তালা খুলে দিয়ে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
গত ১২ মে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ফজিলতুন্নেছা হল–সংলগ্ন সড়ক থেকে এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা একজনকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে ঘটনার পাঁচ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়নি।
এরই ধারাবাহিকতায়, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রোববার সকালে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করেন। অবরোধ চলাকালীন ভবনের ভেতরে থাকা কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বাইরে বের হতে কিংবা নতুন কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ অবস্থায় আটকে থাকেন।
বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মামলার অগ্রগতি এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। উপাচার্যের বক্তব্য শোনার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নতুন করে কিছু দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা ৭ দিনের পরিবর্তে ৩ দিন করা।
আগামী ৩ দিনের মধ্যে অপরাধীকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের এই দাবিগুলোর বিষয়ে উপাচার্য তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত বা উত্তর দেননি। একই সময়ে ভবনের ভেতরে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উত্তেজিত হয়ে উঠলে পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীরা ভবনের তালা খুলে দেন এবং অবরোধ সমাপ্ত ঘোষণা করেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিশা জামান গণমাধ্যমকে জানান, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত হওয়া। উপাচার্য এসে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং অপরাধীকে চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত কমিটির সময়সীমা ৩ দিনে নামিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অনতিবিলম্বে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানান যে, ধর্ষণচেষ্টার এই জঘন্য ঘটনায় জড়িত অপরাধীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
| তারিখ ও সময় | ঘটনা ও বিবরণ |
| ১২ মে, রাত ১১:০০ টা | পরিত্যক্ত ফজিলতুন্নেছা হল সংলগ্ন এলাকায় ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ। |
| ১৩ মে (পরবর্তী দিনসমূহ) | প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের। |
| ১৭ মে, সকাল ১০:০০ টা | নারী শিক্ষার্থীদের দ্বারা নতুন প্রশাসনিক ভবনের দুটি ফটকে তালা দিয়ে অবরোধ শুরু। |
| ১৭ মে, বিকাল ৪:৪৫ টা | উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসানের আগমন এবং তদন্ত ও মামলার অগ্রগতি প্রকাশ। |
| ১৭ মে, সন্ধ্যা ৬:২০ টা | শিক্ষার্থীদের দাবি উত্থাপন এবং ৮ ঘণ্টা পর প্রশাসনিক ভবনের অবরোধ প্রত্যাহার। |
ধর্ষণচেষ্টার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত শনিবার উপাচার্যের বাসভবনের সামনে প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। সেই সময়ে উপাচার্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এক বাগ্বিতণ্ডা সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলনরত নৃবিজ্ঞান বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যায়িত করেন।
এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রোববার দুপুরে উপাচার্যের নিজ বিভাগ—দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। এই মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতী। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান উপাচার্য জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির একজন যোদ্ধা যিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন, তাঁকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক ও অপমানজনক।
একই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। শনিবার রাতে সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ অন্তর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের সকল যৌক্তিক আন্দোলনে পাশে রয়েছে এবং এই অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানার ব্যবহার করে আন্দোলনের একপর্যায়ে উপাচার্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।