ডিসি-ইউএনওরা আর কত কমিটির দায়িত্ব পালন করবেন?
প্রকাশ: সোমবার, ১১ আগস্ট ২০২৫
জেলা ও মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তাদের তত্ত্বাবধানে জেলার ও উপজেলার নানা কমিটি রয়েছে। এসব কমিটির প্রধান দায়িত্বে থাকা ডিসি ও ইউএনওরা বহু দায়িত্বের ভারে চাপা পড়েছেন।
এমনকি নিজের অধিক্ষেত্রে ঠিক কতটি কমিটির সভাপতি, সদস্য সচিব বা সদস্য হিসেবে কাজ করছেন, তা অনেক সময় নিজেরাই সুনিশ্চিত করতে পারেন না। সীমিত জনবল থাকা সত্ত্বেও তারা সরকারি কাজ সম্পাদন করে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়ে ধর্মীয় উপদেষ্টাদের মন্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে নীরব আলোচনা শুরু হয়েছে যে, আর কতগুলো কমিটির দায়িত্ব পালন করতে হবে? তাদের দাবি, সীমিত লোকবল নিয়ে যে কাজ করতে হয়, তাতেই তারা ভারাক্রান্ত।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘এসব কমিটির দায়িত্ব ডিসি ও ইউএনওদের না দিয়ে অন্য কাউকে দিলে সাধারণ মানুষ ও অন্য সরকারি কর্মকর্তা মানবে না। এজন্যই সরকার এসব দায়িত্ব তাদেরই দেন। মানুষ মনে করে ডিসি ও ইউএনওরা থাকলে দুর্নীতি কমে বা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তারা সরকারের আইনকানুন ও প্রটোকল ভালোভাবে বুঝেন, তাই এসব দায়িত্ব তাদের পালন করতেই হয়। অভিজ্ঞতার কারণে এ ধরনের দায়িত্ব পালন করতে তারা তুলনামূলক কম সমস্যা অনুভব করেন।’
দেশের উপজেলাগুলোতে ইউএনওদের অধীনে গড়ে অন্তত ১৫০টির বেশি কমিটি রয়েছে। জেলা প্রশাসকের অধীনে এই সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ কমিটি রয়েছে। তবে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তালিকা নেই। অন্তত তিনজন জেলা প্রশাসক ও ২০ জন ইউএনওয়ের সঙ্গে আলাপ করলে তারা নিজেরাও তাৎক্ষণিক কতটি কমিটির দায়িত্বে রয়েছেন বলতে পারেননি। সরকারি হিসাব মতে, জেলা প্রশাসকের অধীনে প্রায় তিন শতাধিক কমিটি রয়েছে; স্থানীয় সূত্রে ধারণা এই সংখ্যা একশরও বেশি।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, অনেক কমিটির দায়িত্ব নামমাত্র হলেও, প্রতিবেদন প্রদানের জন্য সদস্যদের সামঞ্জস্য রক্ষায় একাধিক কমিটির মিটিং একই দিনে করতে হয়। কমিটির কাজ ও বৈঠকের ফ্রিকোয়েন্সি এজেন্ডার ওপর নির্ভর করে। যেমন: খাসজমির বন্দোবস্ত, সার-বীজ লাইসেন্স, অকেজো ভবনের তালিকা, ভোটকালীন দায়িত্ব, বাসা বরাদ্দ ইত্যাদি। কিছু কমিটির সভা মাসিক, ত্রৈমাসিক বা ছয় মাসে একবার হয়।
সাবেক জেলা প্রশাসকরা বলেন, তারা চাকরি নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকতে হয়। সীমিত জনবল থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সহায়তায় দায়িত্ব পালন সম্ভব হয়।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়ছার বলেন, ‘কমিটির সঠিক সংখ্যা বলতে পারা কঠিন। মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রয়োজন অনুসারে কমিটির সংখ্যা কয়েকশোরও বেশি। সরকারের দেয়া দায়িত্ব প্রত্যাখ্যান করা যায় না, তাই পালন করতেই হয়।’
উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের জনবল কম হওয়ায় তাদের ওপর কমিটির ভার বেশী। সরকারি এসব দায়িত্ব সত্ত্বেও তারা এ নিয়ে অনেক সময় প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। মাত্র পাঁচ-ছয় জন কর্মচারীর সহায়তায় দেড় শতাধিক কমিটির দায়িত্ব পালন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।
এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় কমিটির সংখ্যা ও কার্যক্রমে পার্থক্য দেখা যায়। কিছু কমিটি বিলুপ্ত হয়, কিছু নামে পরিবর্তন হয়, আবার কিছু বিশেষ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে কাজ করে। যেমন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, লাইসেন্স প্রদান, খাসজমি ও বাসা বরাদ্দ ইত্যাদি।
টেকনাফের ইউএনও শেখ এহসান উদ্দীন বলেন, ‘কমিটির সঠিক সংখ্যা মনে নেই, শতাধিক অবশ্যই রয়েছে। সরকারি কর্মপদ্ধতির কারণে প্রায় সব উপজেলায় এ রকমই কমিটি আছে। তবে এলাকা ও ইউনিয়ন অনুসারে তারতম্য থাকে। সরকারের দায়িত্বকে বাড়তি বোঝা ভাবার সুযোগ নেই।’
দেশের বিভিন্ন উপজেলার কমিটির তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় সব উপজেলায় রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, চোরাচালান প্রতিরোধ, গ্রাম আদালত, নদী রক্ষা, তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, সন্ত্রাস প্রতিরোধ, দরপত্র মূল্যায়ন, হাটবাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, এনজিও সমন্বয়, সামাজিক নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, বিভিন্ন প্রকার শিক্ষাবিষয়ক, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক উন্নয়ন সংক্রান্ত কমিটি।
সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, দুর্যোগ প্রতিরোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিশুকল্যাণ, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ, ভূমি সংস্কার, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সমাজকল্যাণ, পল্লী উন্নয়ন, তথ্য প্রযুক্তি, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং অন্যান্য সরকারি ও স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এসব কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বলেন, ‘জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটির সংখ্যা বেশি হলেও তা বিশেষ চাপের বিষয় নয়। কমিটির বৈঠক বছরে, ছয় মাসে, তিন মাসে বা মাসিক হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু কমিটি সব জায়গায় থাকে, আবার এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটির সংখ্যা ও প্রকারে পার্থক্য হয়।’
খবরওয়ালা/এমএজেড