রাজধানী ঢাকার আটটি পুলিশ বিভাগে ৪০১ জন অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশের বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অস্ত্রধারী শনাক্ত হয়েছেন মতিঝিল এলাকায়। এ বিভাগে ১১৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে, যা রাজধানীতে শনাক্ত মোট অস্ত্রধারীর প্রায় ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ। তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ওয়ারী বিভাগ, যেখানে শনাক্ত হয়েছেন ৭৩ জন। তেজগাঁও ও মিরপুর বিভাগেও অস্ত্রধারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য—যথাক্রমে ৬১ ও ৬০ জন।
রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, গুলিবর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেই এই তথ্য সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্রের একটি অংশ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র দেশে প্রবেশের তথ্যও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ডিএমপির আট বিভাগের মধ্যে অস্ত্রধারী শনাক্তের সংখ্যায় মতিঝিলের পর রয়েছে ওয়ারী। এ ছাড়া তেজগাঁও ও মিরপুর বিভাগে প্রায় সমসংখ্যক অস্ত্রধারী শনাক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে রমনা, লালবাগ, গুলশান ও উত্তরা বিভাগে শনাক্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে এসব সংখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অপরাধের প্রকৃত মাত্রা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না। শনাক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কাছে অস্ত্র থাকার প্রমাণ কী এবং কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে—এসব তথ্য জানা গেলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাবে।
বিভাগভিত্তিক অস্ত্রধারীর চিত্র
ডিএমপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটটি বিভাগের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
| পুলিশ বিভাগ | শনাক্ত অস্ত্রধারী |
|---|---|
| মতিঝিল | ১১৮ জন |
| ওয়ারী | ৭৩ জন |
| তেজগাঁও | ৬১ জন |
| মিরপুর | ৬০ জন |
| রমনা | ৩৬ জন |
| লালবাগ | ২৪ জন |
| গুলশান | ১৬ জন |
| উত্তরা | ১৩ জন |
| মোট | ৪০১ জন |
তালিকায় মতিঝিল বিভাগে শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ওয়ারী বিভাগের চেয়ে ৪৫ জন বেশি। অন্যদিকে উত্তরা বিভাগে শনাক্ত হয়েছেন ১৩ জন, যা আট বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে এই পরিসংখ্যানকে অপরাধপ্রবণতার সরাসরি সূচক হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। শনাক্তের পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি
অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের আগস্টে পুলিশের হেফাজত থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৬০টি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ১ হাজার ৩০৩টি অস্ত্রের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ২২ দশমিক ৬ শতাংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্রের কতগুলো বর্তমানে অপরাধীদের হাতে রয়েছে, কতগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কিংবা কতগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। নিখোঁজ অস্ত্রগুলোর বিভাগভিত্তিক হিসাবও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, দেশের সীমান্তবর্তী ২০টি পথ দিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে। সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচার বন্ধ করা এবং দেশে প্রবেশ করা অস্ত্রের সরবরাহ চক্র শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ, অবৈধ অস্ত্র একবার অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছে গেলে তা উদ্ধার করা এবং সরবরাহের উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
নয় মাসে উদ্ধার ১,৪৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৪৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে দেশে ২ হাজার ৬৫৯টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।
এই দুই পরিসংখ্যান দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আনে। তবে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সংখ্যা ও হত্যা মামলার সংখ্যার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। সব হত্যাকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয় না; আবার উদ্ধার হওয়া সব অস্ত্রও যে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে, তা নয়।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গত মে মাসে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। অভিযানের লক্ষ্য অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের শনাক্ত এবং অস্ত্রের অবৈধ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা। এরপরও গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অব্যাহত থাকায় অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের জন্য অস্ত্র উদ্ধারের পরিমাণের পাশাপাশি গ্রেপ্তার, মামলার অগ্রগতি, অস্ত্রের উৎস শনাক্ত এবং অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের যোগসূত্রের তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের অগ্রগতি বুঝতে সুবিধা হবে।
রাজধানীতে ৪০১ জন অস্ত্রধারী শনাক্তের তথ্য তাই শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়; এটি অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চলমান চ্যালেঞ্জেরও ইঙ্গিত দেয়। শনাক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র প্রবেশ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ।


