গত কয়েক বছরে বায়ুদূষণ পাকিস্তানের অন্যতম বড় পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে লাহোরসহ পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন শহরে ধোঁয়াশার প্রকোপ বাড়ে। শিল্পকারখানার নির্গত ধোঁয়া, যানবাহনের দূষিত গ্যাস, কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং নির্মাণকাজের ধুলাবালু এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও বাতাসের গতিপ্রকৃতি যুক্ত হয়ে দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আইকিউএয়ারের ওই সময়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দূষিত বড় শহরের তালিকায় লাহোরের পর দ্বিতীয় স্থানে ছিল মিসরের রাজধানী কায়রো। শহরটির একিউআই ছিল ২৮৯। ভারতের রাজধানী দিল্লি ২৭২ একিউআই নিয়ে তৃতীয় স্থানে ছিল। চতুর্থ অবস্থানে থাকা উজবেকিস্তানের তাসখন্দের একিউআই ছিল ১৮৬। পাকিস্তানের আরেক বড় শহর করাচি ১৭৩ একিউআই নিয়ে পঞ্চম স্থানে ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বায়ুমান সূচকের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, একিউআই ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মানকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসাবে লাহোর, কায়রো ও দিল্লির বায়ুমান ছিল এই শ্রেণিতে। লাহোরের সূচক ২৯৬ হওয়ায় শহরটির বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
দূষিত বাতাসের প্রভাব সবার ওপর পড়তে পারে। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং হাঁপানি, হৃদ্রোগ কিংবা অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বাতাসে ক্ষতিকর কণার ঘনত্ব বেড়ে গেলে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, কাশি এবং শ্বাসতন্ত্রে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ আরও তীব্র হতে পারে।
লাহোরে ভোরের দিকে তাপমাত্রা কমে এলে ধোঁয়াশা ঘন হয়ে দৃশ্যমানতা কমিয়ে দিচ্ছে। এতে সড়কে চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে দীর্ঘ সময় বাইরে অবস্থান এবং খোলা জায়গায় ভারী শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে হাঁপানি ও অন্যান্য শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
পাকিস্তানের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) মুখপাত্র সাজিদ বশির দেশটির সংবাদমাধ্যম ডনকে জানিয়েছেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে শিল্পকারখানাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দূষণের মাত্রা পরিমাপের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রও স্থাপন করেছে কর্তৃপক্ষ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবহাওয়ার পরিবর্তন ধোঁয়াশার পরিস্থিতি খারাপ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো বন্ধ করতেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সাজিদ বশির বলেন, ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে পূর্ব দিকের বাতাস দূষিত বায়ুকে লাহোরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে মধ্য পাঞ্জাবের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধোঁয়াশার প্রকোপ বাড়ছে। তবে স্থানীয় শিল্পকারখানা, যানবাহন ও নির্মাণকাজ থেকে নির্গত দূষণও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
ধোঁয়াশা মোকাবিলায় পাকিস্তান সরকার বৈদ্যুতিক ট্রাকে বসানো আরও ৩০টি আধুনিক ফগ ক্যানন সংগ্রহ ও স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে বাতাসে থাকা ধুলাবালু কমানোর চেষ্টা করা হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পিএম১০ নামে পরিচিত অপেক্ষাকৃত বড় বায়ুকণার উপস্থিতি বেশি, সেসব স্থানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অ্যান্টি-স্মগ গান ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান বশির।
পিএম১০ হলো বাতাসে ভাসমান এমন কণা, যেগুলোর ব্যাস ১০ মাইক্রোমিটার বা তার কম। এসব কণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়াতে পারে। পানি ছিটিয়ে কিছু ক্ষেত্রে ধুলাবালু সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও শিল্পকারখানা ও যানবাহনের নির্গমন কমানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
লাহোরসহ পাঞ্জাবের বিভিন্ন শহরে চলমান উন্নয়নকাজও দূষণ বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন সাজিদ বশির। নির্মাণকাজের সময় যথাযথভাবে ধুলা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে বাতাসে দূষিত কণার পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই শিল্পকারখানার পাশাপাশি নির্মাণস্থল ও সড়ক উন্নয়নকাজেও পরিবেশগত বিধিনিষেধ কার্যকর করা জরুরি।
শিল্পকারখানার ওপর নজরদারি জোরদার করতে পাঞ্জাব ক্লাইমেট ওয়াচ তিন পালায় কাজ করছে। বশিরের তথ্য অনুযায়ী, পরিদর্শক দল কারখানাগুলোতে পরিবেশগত নিয়মকানুন মানা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করছে। অনিয়ম শনাক্ত হলে মামলা করা হচ্ছে এবং জরিমানাও আরোপ করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের ফলে বায়ুমানের দৃশ্যমান উন্নতি হতে সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এর আগের সপ্তাহেও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল লাহোর। সে সময় শহরটির বায়ুমান ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এর আগে ২ অক্টোবর আইকিউএয়ারের তালিকায় লাহোরের একিউআই ছিল ১৬৭, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ওই সময় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ বলেছিলেন, পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।
এদিকে, বায়ুদূষণের পাশাপাশি ওজোনের মাত্রা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ১ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের অধীন কোপার্নিকাস অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের (সিএএমএস) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে লাহোরকে এমন শহরগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছিল, যেখানে ওজোনের মাত্রা অত্যন্ত খারাপ পর্যায়ে ছিল। ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা ওজোন একটি ক্ষতিকর বায়ুদূষক, যা ফুসফুসে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।
বারবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকার শীর্ষে উঠে আসা লাহোরের জন্য শীতকাল নতুন করে জনস্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি করছে। সরকার দূষণ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি, জরিমানা এবং ধুলাবালু কমানোর যন্ত্র ব্যবহারের মতো উদ্যোগ নিলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্পকারখানা ও যানবাহনের নির্গমন কমানো, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো বন্ধ এবং আঞ্চলিক দূষণ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতি না হলে শীতের মৌসুমে লাহোরের বাসিন্দাদের বারবার ঘন ধোঁয়াশা ও দূষিত বাতাসের ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।


