খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও সংসদ ভবন ঘেরাও কর্মসূচির মুখে অবশেষে নিজের বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে দাঁড়িয়ে তিনি এই দুঃখ প্রকাশ করেন।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে কিছু বলিনি। তারপরও আমার কথায় কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন, তবে আমি ‘সিম্প্লি’ দুঃখ প্রকাশ করছি।” সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে তার একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সংসদে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
বক্তব্য চলাকালে শিক্ষামন্ত্রী চলমান এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন জেলাগুলোতে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। এই পরীক্ষাগুলো অবশ্যই পুনরায় নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের নানা দাবি ও ভোগান্তির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, চট্টগ্রাম বোর্ডে যখন পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, যুক্তিবিদ্যা এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা অন্য আরেকটি প্রশ্নপত্র সেটে নেওয়া হবে, ঠিক সেই সময়েই স্থগিত হওয়া আগের পরীক্ষাগুলোও একসঙ্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
এর আগে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি পর্যায়ক্রমে গত ৮, ১১, ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সব জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলোর মধ্যে ছিল ইংরেজি ২য় পত্র (৮ জুলাই), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (১১ জুলাই), পদার্থবিদ্যা প্রথম পত্র, হিসাব বিজ্ঞান প্রথম পত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র (১৩ জুলাই), পদার্থবিদ্যা দ্বিতীয় পত্র, হিসাব বিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র ও যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্র (১৫ জুলাই) এবং ভূগোল প্রথম পত্র, উচ্চাঙ্গসংগীত প্রথম পত্র, পালি প্রথম ও আরবি প্রথম পত্র (১৬ জুলাই)।
মন্ত্রীর এই দুঃখ প্রকাশের নেপথ্যে ছিল দিনভর শিক্ষার্থীদের উত্তাল আন্দোলন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর, উত্তরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এতে পুরো ঢাকা শহর তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে। বিকেল ৫টার দিকে সায়েন্সল্যাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে সিটি কলেজের পরীক্ষার্থী মো. মিরাজ হোসেন তিন দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল— সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও অসংগতিপূর্ণ বক্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, ১৩ জুলাইয়ের পরীক্ষা পুনরায় নেওয়া এবং প্রশ্নপত্রের মান শিক্ষার্থীবান্ধব করা।
অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ সংক্রান্ত মন্তব্যের জবাবে স্লোগান দিতে থাকেন— ‘তুমি কে, আমি কে? ফার্মের মুরগি’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে? শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী’। বিকেল সোয়া ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা সায়েন্সল্যাব থেকে মিছিল নিয়ে সংসদ ভবনের উদ্দেশে রওনা দিয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে মূল ফটকে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সেখানে লাঠিচার্জ করে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেয়। এরপর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ধানমন্ডি আড়ংয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির পরপরই সংসদে মন্ত্রীর তরফ থেকে দুঃখ প্রকাশের এই ঘোষণা আসে।