খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ২:৩১ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পণ্যবাহী ট্রাকে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন চালক জামাল উদ্দিন। তবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি তার সহকারীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন গাড়ি না থামানো হয়। চালকের সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ করতেই রক্তাক্ত লাশ কেবিনে রেখে সারারাত গাড়ি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত মীরসরাইয়ে এসে পৌঁছান হেলপার বেলাল হোসেন। পরে স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় লাশটি উদ্ধার করা হয়।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাপাহাড় এলাকার ‘ফারদিন মডেল পাম্প’-এর সামনে পার্কিং করা একটি মিনি লরি থেকে চালকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত চালক জামাল উদ্দিন (৫৬) ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার উত্তর চর আইচা এলাকার মৃত মুনাফ বেপারীর ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে পণ্যবাহী দূরপাল্লার গাড়ি চালিয়ে আসছিলেন।
ট্রাকচালকের একমাত্র সহকারী বেলাল হোসেন এই লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে জানান, সোমবার দিবাগত রাতে তারা সিলেটের শেরপুর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে স্ক্যাপ লোহাবোঝাই করে রওনা দিয়েছিলেন। গভীর রাতে লরিটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উজানিসার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছায়। ওই এলাকায় সড়ক সংস্কার কিংবা অন্য কোনো কারণে রাস্তা বেশ সরু ছিল। ফলে চালক জামাল উদ্দিন বাধ্য হয়ে গাড়ির গতি কমিয়ে দেন।
ঠিক এই সুযোগটিই নেয় ওত পেতে থাকা একদল অপরাধী। হুট করেই চার থেকে পাঁচজন দুর্বৃত্ত দেশীয় ও ধারাল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে লরির ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা প্রথমে গাড়ির সামনের কাচ ভাঙচুর করে। চালক জামাল উদ্দিন বাধা দিতে গেলে সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। ধারাল অস্ত্রের আঘাতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত তৈরি হয় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে।
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও জামাল উদ্দিন অসীম সাহসের পরিচয় দেন। তিনি নিজের গায়ের কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থান কোনোভাবে বেঁধে সহকারী বেলালকে স্টিয়ারিংয়ে বসিয়ে দেন এবং দ্রুত গাড়ি চালিয়ে ওই এলাকা পার হতে বলেন। বেলাল জানান, ওস্তাদের নির্দেশনা মেনে তিনি আতঙ্কিত অবস্থায় লরি চালিয়ে ফেনী সীমানা পর্যন্ত পৌঁছান। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে পথিমধ্যেই জামাল উদ্দিনের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং তিনি মারা যান।
চলন্ত গাড়িতে ওস্তাদের মৃত্যুর পর হেলপার বেলাল আরও বেশি ঘাবড়ে যান। মহাসড়কে ডাকাত বা সন্ত্রাসীদের পুনরুত্থানের ভয়ে তিনি গাড়ি না থামিয়ে মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থানা এলাকার ফারদিন মডেল পাম্পে এসে লরিটি পার্ক করেন। সেখানে অন্য চালকদের বিষয়টি জানানোর পর পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল হালিম দ্রুত ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পুলিশ লরির ভেতর থেকে রক্তাক্ত মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
ওসি মোহাম্মদ আব্দুল হালিম জানান, সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতের শরীরে ধারাল অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে যেহেতু মূল অপরাধের ঘটনাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আওতাধীন উজানিসার এলাকায় ঘটেছে, তাই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া, তদন্ত এবং নিয়মিত মামলা দায়েরের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাই দেখভাল করবে। জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ এই বিষয়ে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র দিয়ে সহায়তা করছে।
মন্তব্য