খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ২:৩৮ পিএম
ভোলার মনপুরায় এক সাধারণ কৃষককে গ্রামপুলিশ (চৌকিদার) দিয়ে জোরপূর্বক তুলে এনে বিএনপি কার্যালয়ে আটকে রেখে মারধর এবং মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এক বিএনপি নেতা তথা ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের বিরুদ্ধে এই অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর ভুক্তভোগীকে হেনস্তা করতে বাজারে বাজারে ঘোরানো হয় বলেও জানা গেছে। ইতিমধ্যেই এই লাঞ্ছনাকর ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পুরো জেলায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুর ২টায় মনপুরা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে লিখিতভাবে এই অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী কৃষক মো. আলাউদ্দিন (৩৫)। তিনি মনপুরা উপজেলার ৩ নম্বর উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। গত শনিবার (১১ জুলাই) সকালে উপজেলার উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকার স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ে আলাউদ্দিন জানান, স্থানীয় ফরিদ ও কালাম নামের দুই ব্যক্তির সঙ্গে তার দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। ওই বিরোধের সূত্র ধরে তারা আলাউদ্দিনের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে মনপুরা উপজেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার হস্তক্ষেপে জমি সংক্রান্ত বিরোধটির একটি সুষ্ঠু সমাধান হয়।
তবে ঘটনার মোড় ঘোরে গত শনিবার সকালে। জমি সংক্রান্ত বিরোধে ব্যর্থ হয়ে প্রতিপক্ষ ফরিদ ও কালাম ওই কৃষকের বিরুদ্ধে একটি বানোয়াট ‘নারী সংক্রান্ত’ অপবাদ তোলেন। এই অভিযোগের সূত্র ধরে স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা জাকির হোসেন দুলাল গ্রামপুলিশ পাঠিয়ে আলাউদ্দিনকে তার বাড়ি থেকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে আসেন। এরপর তাকে বাংলাবাজার বিএনপি কার্যালয়ে এনে আটকে রাখা হয়।
আলাউদ্দিন অভিযোগ করেন, ইউপি সদস্য জাকির হোসেন দুলালের নেতৃত্বে সেখানে তাকে বাঁশ ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। একপর্যায়ে বলপূর্বক কাঁচি দিয়ে তার মাথার চুল কেটে ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। নির্যাতনের এখানেই শেষ ছিল না; তাকে সামাজিকভাবে চূড়ান্ত হেয়প্রতিপন্ন করতে ন্যাড়া মাথায় পুরো বাজারে ঘুরিয়ে তামাশা করা হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভুক্তভোগী কৃষক বলেন, “ওদের অমানুষিক মারধরে আমি শারীরিকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি। কিন্তু তাদের ভয়ে ঠিকমতো হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে পারিনি। আমার ছেলে একজন কুরআনে হাফেজ। সমাজে আমি এখন মুখ দেখাতে পারছি না। পরিবারের সদস্যদের সামনে দাঁড়াতে পারছি না। আমার এখন আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।” তিনি এই ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্য জাকির হোসেন দুলাল মারধর ও চুল কাটার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তার দাবি, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য তার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
তবে এই ঘটনাকে মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন মনপুরা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাহাত। তিনি বলেন, “কোনো নাগরিকের অপরাধ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। একজন মানুষের চুল কেটে বাজারে ঘোরানো চরম মানহানিকর ও দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগী চাইলে ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলা করতে পারেন।”
এদিকে দলীয় কার্যালয়ে এমন ন্যাক্কারজনক কাণ্ডে চরম বিব্রত স্থানীয় বিএনপি নেতৃত্ব। মনপুরা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ডা. কামাল উদ্দিন এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান মিলন মাতাব্বর যৌথভাবে জানান, দলীয় কার্যালয় কোনো বিচার সালিশের জায়গা নয়। সেখানে ডেকে এনে একজন কৃষককে এভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন।
যোগাযোগ করা হলে মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম জানান, গণমাধ্যমকর্মীদের কাছ থেকেই তারা বিষয়টি প্রথম জেনেছেন। এখন পর্যন্ত থানায় কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি। তবে ঘটনার শিকার ওই কৃষক লিখিত অভিযোগ দিলে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য