খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ২:৪৮ পিএম
বকেয়া বেতনের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে এক স্কুলশিক্ষিকাকে ঘরে আটকে দা দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করার অভিযোগ উঠেছে এক ছাত্রীর মায়ের বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষিকার মাথায় ১০টি কোপ লেগেছে এবং তার একটি আঙুল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সোমবার সকালে ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পানাউল্লাহরচর গ্রামে এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত নারী প্রিয়া বেগমকে (২৫) স্থানীয়রা হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছেন। প্রিয়া একই এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী বায়েজিদ মিয়ার স্ত্রী।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকার নাম সিঁথি সীমিতা (২৮)। তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিঁথি সীমিতা গত তিন মাস ধরে প্রিয়া বেগমের সন্তানকে তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়াতেন। মাসিক দেড় হাজার টাকা চুক্তিতে এই টিউশনি করতেন তিনি। কয়েক দিন আগে তিন মাসের বকেয়া টাকা চাইলে প্রিয়া বেগম তার ওপর মনে মনে ক্ষুব্ধ হন। সোমবার সকালে যথারীতি ওই শিক্ষার্থীকে পড়াতে যান সিঁথি। পড়া শেষ করে যখন তিনি চলে আসতে উদ্যত হন, ঠিক তখনই প্রিয়া বেগম ঘরের মূল দরজা বন্ধ করে দেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি একটি ধারাল দা নিয়ে সিঁথির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন।
আক্রান্ত শিক্ষিকা ঘর থেকে পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সিঁথি সীমিতা জানান, অন্যান্য দিন ঘরের দরজায় একটি ছিটকিনি লাগানো থাকলেও সেদিন পরিকল্পিতভাবে দুটি ছিটকিনি আটকে দেওয়া হয়েছিল। ফলে ভেতরে আটকা পড়ে যান তিনি। প্রিয়া বেগম তার মাথায়, পিঠে ও হাতে উপুর্যপরি কোপাতে থাকেন। কোপানোর একপর্যায়ে সিঁথির শরীরে থাকা গহনা দেখে প্রিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, “আমার কাছে এক আনা স্বর্ণ নেই, তুই এত স্বর্ণ পরে আছিস কেন? স্বর্ণ দে।” শিক্ষিকার গলায়, হাতে ও কানে মিলিয়ে প্রায় দুই ভরি ওজনের স্বর্ণালংকার ছিল।
সিঁথির আর্তচিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে দরজা ভেঙে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় প্রিয়া বেগমকে তারা ঘরেই আটকে রাখেন এবং পরে পুলিশে খবর দেন। গুরুতর আহত সিঁথিকে প্রথমে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে চিকিৎসকেরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সিঁথির মাথায় ১০টি কোপের গভীর ক্ষত রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫০টি সেলাই দিতে হয়েছে। এছাড়া তার হাতের সাতটি আঙুল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি আঙুল পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষিকার স্বজন শিশু মিয়া বাদী হয়ে ভৈরব থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর পুলিশ প্রিয়া বেগমকে গ্রেপ্তার দেখায়। আজ মঙ্গলবার দুপুরে তাকে কিশোরগঞ্জ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার বাদী শিশু মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “এটি কেবল বেতনের টাকার ক্ষোভ নয়, বরং স্বর্ণালংকার ছিনতাই ও হত্যার উদ্দেশ্যে একটি পরিকল্পিত হামলা ছিল। প্রিয়া এর আগেও এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এখন তার পরিবার তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন সাজিয়ে অপরাধ লঘু করার চেষ্টা করছে।” ভৈরব অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষকেরা এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি তুলেছেন। ভৈরব থানার জ্যেষ্ঠ উপপরিদর্শক এমদাদুল কবির জানান, ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য