তীব্র দাবদাহে ইউরোপে ব্যবসায়ে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি, বিমার ঘাটতিতে ঝুঁকিতে উদ্যোক্তারা

বছরের পর বছর ধরে ইতালির ঐতিহাসিক শহর পাদোয়ার ক্যাফেগুলোতে বিকেলে একটু স্বস্তির পানীয় বা আড্ডা দেওয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তবে চলতি বছরে ইউরোপজুড়ে একের পর এক তীব্র দাবদাহের কারণে এই চেনা দৃশ্য বদলে গেছে। বিকেল ৬টা থেকে ৭টার সেই পরিচিত জমজমাট সময়টুকু প্রায় উধাও হতে বসেছে। কড়া রোদ আর অসহ্য গরম এড়াতে মানুষ এখন ঘরের ভেতরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছেন। যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়েছে স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা ব্যবস্থার ওপর। বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সমস্যাটি কেবল ইতালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তাপদাহের কারণে ব্যবসার যে ক্ষতি হচ্ছে, প্রচলিত ব্যবসায়িক ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিমার (বিজনেস ইন্টারাপশন ইন্স্যুরেন্স) আওতায় তা কভার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই বড় ধরনের কোনো আর্থিক সুরক্ষা ছাড়া ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বখ্যাত গবেষণা ও রেটিং সংস্থা মুডি’সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের দাবদাহে ইউরোপীয় অর্থনীতির প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি ইউরো বা ৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করেছে মাত্র ৫০ কোটি ইউরো।
পাদোয়ার স্থানীয় অ্যাপে পাদোভা (APPE Padova) নামক একটি আতিথেয়তা সমিতির প্রধান ফেদেরিকা লুনির ভাষ্যমতে, খোলা জায়গায় বা বারান্দায় বসে খাবার বা পানীয় উপভোগ করার সংস্কৃতি এখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শহর ও এর আশেপাশের প্রায় ৬০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দাবদাহের কারণে ৮০ শতাংশেরও বেশি ব্যবসার বিক্রি গড়ে অন্তত ২০ শতাংশ কমে গেছে। ব্যবসায়িক মার্জিন তুলে আনার ক্ষেত্রে এই ২০ শতাংশ ক্ষতি অত্যন্ত বড় আঘাত।
প্রাকৃতিক অন্যান্য দুর্যোগ যেমন বন্যা বা ঝড়ের ক্ষেত্রে সম্পদের সরাসরি দৃশ্যমান ক্ষতি হয়। ফলে বীমার দাবি আদায় করা সহজ হয়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমের ক্ষেত্রে কোনো অবকাঠামোগত বা দৃশ্যমান ক্ষতি না হলেও কার্যক্রমে বড় বিঘ্ন ঘটে। ফলে এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা বা বীমা পলিসির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চরম তাপদাহ তৈরি করে পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি।
ইউরোপীয় বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ২০২৩ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, ৯ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৮ শতাংশের সম্পত্তি বিমার সাথে ব্যবসায়িক ক্ষতির সুরক্ষার শর্ত যুক্ত ছিল। আর ১৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো প্রত্যক্ষ ক্ষতি না হওয়া সত্ত্বেও কাজ আটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির ক্ষতিপূরণ বিমা ছিল। দাবদাহের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি ট্রেন দেরিতে চলা, কৃষিতে উৎপাদন কমে যাওয়া, কারখানায় কুলিং খরচ বৃদ্ধি পাওয়া এবং কর্মীদের কাজের গতি কমে যাওয়ার মতো বহুমুখী সংকট তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি সুইডেনের আইটিএবি (ITAB Group), ইতালির বুজ্জি (Buzzi) এবং ফ্রান্সের ওয়ার্ল্ডলাইন (Worldline) এর মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোও গরমের কারণে তাদের আয় কমার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
জলবায়ু পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ। পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘সিডিপি’র জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই স্বীকার করেছে যে, অতিরিক্ত গরম তাদের ব্যবসার জন্য অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যমান এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক বীমা খাত এখন ‘প্যারামেট্রিক বিমা’ ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এই পদ্ধতিতে তাপমাত্রা যদি পূর্বনির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তবে জটিল কোনো ক্ষয়ক্ষতি যাচাই প্রক্রিয়া ছাড়াই বিমা গ্রহীতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত অর্থ পেয়ে যান। বিশেষ করে কৃষি খাত, গণপরিবহন এবং কারখানা কর্মীদের সুরক্ষায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে এই প্যারামেট্রিক বিমার বাজার ২০৩১ সালের মধ্যে প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কেবল বিমার ওপর ভরসা করে বসে না থেকে নিজেদের কাজের ধরন ও অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। কাজের জায়গায় আধুনিক কুলিং ব্যবস্থার বিনিয়োগ করা, সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা এবং অতিরিক্ত গরম সামলানোর মতো উপযুক্ত কৌশল গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর বিমার টাকা দিয়ে ক্ষতি পূরণের চেয়ে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
Tags :

Shakib

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ খবর