খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে আকাশ, যার ফলে দিনের অধিকাংশ সময় সূর্যের দেখা মিলছে না। হিমেল বাতাস আর কনকনে ঠান্ডায় স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে, যা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
নিকলীর হাওরাঞ্চলে হাড়কাঁপানো শীতের প্রভাব
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার কুর্শা এলাকার ৬৫ বছর বয়সী ফারুক মিয়া জানান, তাঁর দীর্ঘ জীবনে এমন হাড়কাঁপানো শীত তিনি খুব কমই দেখেছেন। হাওরাঞ্চলে এখন বোরো ধান রোপণের ভরা মৌসুম, কিন্তু তীব্র ঠান্ডার কারণে শ্রমিকরা মাঠে নামতে পারছেন না। ফারুক মিয়ার ভাষায়, “শরীরে যেন রক্ত জমে যাচ্ছে, শীতে কাজে যেতে পারছি না; এভাবে চললে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হবে।” শুধু নিকলী নয়, মেহেরপুর, পঞ্চগড় এবং উত্তরের সীমান্ত জনপদগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
আবহাওয়ার বর্তমান চিত্র ও পূর্বাভাস
আবহাওয়াবিদদের মতে, আকাশে মেঘ ও কুয়াশার আধিক্য থাকায় দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে এসেছে, যা শীতের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সাধারণত ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে বৃষ্টি হয়ে কুয়াশা কেটে যায়, কিন্তু এবার লঘুচাপের অনুপস্থিতিতে ঘন কুয়াশা স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
একনজরে দেশের আবহাওয়া ও তাপমাত্রার পরিসংখ্যান:
| অঞ্চলের নাম | সর্বনিম্ন তাপমাত্রা | বিশেষ পরিস্থিতি |
|---|---|---|
| নিকলী (কিশোরগঞ্জ) | ১০° সেলসিয়াস | দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ও শৈত্যপ্রবাহ। |
| তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়) | ১২° সেলসিয়াস | হিমেল হাওয়া ও সারাদিন কুয়াশা। |
| রাজশাহী ও উত্তরবঙ্গ | ১১° – ১৩° সেলসিয়াস | ঠান্ডাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি। |
| মেহেরপুর ও দক্ষিণ-পশ্চিম | ১২° – ১৪° সেলসিয়াস | শ্রমজীবী মানুষের কর্মহীনতা ও ঘন কুয়াশা। |
| ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা | ১৪° – ১৬° সেলসিয়াস | কুয়াশার কারণে বিমান ও সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন। |
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে রাজধানীসহ সারা দেশে ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। রাজশাহী ও মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের ভিড় বাড়ছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টিটো মিঞা জানান, তীব্র ঠান্ডায় রক্তনালি সংকুচিত হয়ে ‘ফ্রস্টবাইট’ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি বেশি বিপজ্জনক। তিনি এই সময়ে শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সতর্কতা ও করণীয়:
পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরিধান করা এবং কান ও গলা ঢেকে রাখা।
অপ্রয়োজনে ভোরে বা রাতে বাইরে বের না হওয়া।
কুসুম গরম পানি পান করা এবং বাসি খাবার পরিহার করা।
বয়স্কদের হাত ও পায়ে তাপ দেওয়া এবং ত্বক শুষ্ক হওয়া থেকে বাঁচাতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা।
পরিবহন ও যোগাযোগে বিপর্যয়
ঘন কুয়াশার কারণে দেশের নৌ-পথ, সড়ক এবং বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মহাসড়কগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়েও যানবাহন চলাচল করতে হিমশিম খাচ্ছে চালকরা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার থেকে কুয়াশা কিছুটা কমতে পারে এবং রোদ উঠলে শীতের তীব্রতা সামান্য হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।