খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
মানবিকতার চরম বিপর্যয় আর এক বুক হাহাকারের চিত্র ফুটে উঠেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। হাড়কাঁপানো কনকনে শীতের রাতে অসুস্থ দুই শিশু সন্তানকে সড়কের পাশে ফেলে রেখে চলে গেছেন জন্মদাতা মা-বাবা। গত রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের মাজারগেট এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। চার বছর বয়সী বড় বোন আয়শা তার দুই বছর বয়সী অসুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ছোট ভাইকে তীব্র শীতের হাত থেকে রক্ষা করতে পরম মমতায় আগলে ধরে বসে ছিল।
উদ্ধার অভিযান ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত
সন্ধ্যা নামার পর সড়কের পাশে দীর্ঘক্ষণ দুই শিশুকে শীতে কাঁপতে দেখে এগিয়ে যান মহিম উদ্দিন নামের এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। লোকালয়ে অপরিচিত দুই শিশুকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখে তিনি তাদের সাথে কথা বলেন। বড় শিশু আয়শা অসংলগ্নভাবে যা জানায়, তাতে মহিম উদ্দিন বুঝতে পারেন তাদের কেউ এখানে ফেলে রেখে গেছে। মানবিক তাড়নায় তিনি শিশু দুটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। মহিমের স্ত্রী শারমিন আক্তার জানান, শিশু দুটি অত্যন্ত অসুস্থ ছিল। বিশেষ করে ছোট ছেলেটি ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধী। তারা শিশুদের গরম পানি দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে খাবার খাওয়ানোর পর শিশুরা কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
শিশুদের পরিচয় ও ঘটনার নেপথ্য
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বড় বোন আয়শা তার পরিবারের যে পরিচয় দিয়েছে, তা নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| বড় শিশুর নাম ও বয়স | আয়শা (০৪ বছর) |
| ছোট শিশুর নাম ও বয়স | নাম অজানা (০২ বছর, শারীরিক প্রতিবন্ধী) |
| বাবার নাম | খোরশেদ আলম |
| মায়ের নাম | ঝিনুক আখতার |
| স্থায়ী ঠিকানা (সম্ভাব্য) | মৌলভীর দোকান এলাকা, সাতকানিয়া উপজেলা |
| ফেলে যাওয়ার ধরন | জনৈক খালা সড়কের পাশে বসিয়ে রেখে পালিয়ে যান |
আয়শার ভাষ্যমতে, তাদের মা-বাবার কাছ থেকে এক খালা তাদের নিয়ে এসে এখানে বসিয়ে রেখে চলে যান। স্থানীয়দের ধারণা, দুই শিশুই অসুস্থ এবং ছোটটি প্রতিবন্ধী হওয়ায় চিকিৎসা বা লালন-পালনের ভার এড়াতে পাষণ্ড মা-বাবা পরিকল্পিতভাবে এই অমানবিক কাজ করেছেন।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আনোয়ারা থানা পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। সাব ইন্সপেক্টর মোমেন জানান, তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং শিশুদের ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য পার্শ্ববর্তী সকল থানায় প্রেরণ করেছেন। তাদের পরিবারের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার এই ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, শিশুদের নিরাপত্তা ও সুচিকিৎসার স্বার্থে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তাদের সরকারি সেফহোমে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন ও সমাজসেবা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে শিশু দুটি প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
তীব্র এই শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে নিজ সন্তানদের এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাটি পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ দোষী মা-বাবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং শিশু দুটির সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।