খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ২২ নভেম্বর ২০২৫
লোকসঙ্গীতের মাটিতে দাঁড়িয়ে গণসংগীতের যে দীপ্ত শিখাটি বাংলার জনমানসে জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, সেই শিখার নাম— হেমাঙ্গ বিশ্বাস। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন; ছিলেন একাধারে কবি, সুরকার, লেখক, সংগ্রামী রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গান।
১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিলেটের হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাসি গ্রামে জন্ম নেওয়া হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শিকড় ছিল গভীরভাবে বাংলার মাটির সঙ্গে যুক্ত। পিতা হরকুমার বিশ্বাস এবং মা সরোজিনী দেবীর স্নেহে বেড়ে ওঠা এই শিশুটি পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের শিল্পী।
হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে শিক্ষা শেষে মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হয়ে তিনি পরিচিত হন স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল হাওয়ার সঙ্গে। ১৯৩২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে এসে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে ১৯৩৫ সালে প্রথমবারের মতো কারাবন্দি হন এবং কঠোর জীবনযাপনে আক্রান্ত হন যক্ষ্মায়।
রাজপথে সংগ্রামী এই শিল্পী থেমে থাকেননি; ১৯৪৮ সালের তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময় তিনি আবারও কারাবন্দি হন— এবার তিন দীর্ঘ বছর।
১৯৩৮-৩৯ সালে বিনয় রায়, নিরঞ্জন সেন, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখের সঙ্গে গড়ে তোলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)। গণমানুষের শিল্পকে সংগঠিত করার এ উদ্যোগ ছিল ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক মাইলফলক।
তাঁরই উদ্যোগে ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সিলেট গণনাট্য সংঘ’, যা মানুষের অন্তর্গত বেদনা, সংগ্রাম ও আশার গল্প তুলে ধরেছিল নাট্য-সঙ্গীতের মঞ্চে।
এই সময় তাঁর অমর গান—
“তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান”,
“কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী”
আসাম-বাংলার জনপদে আন্দোলনের গান হয়ে ওঠে। কৃষকশ্রমিকের অস্তিত্ব, প্রান্তিক মানুষের বেদনা এবং সংগ্রামী চেতনা ছিল তাঁর সুরের মূল শক্তি।
শুধু দেশেই নয়— আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক বন্ধুত্বের দূত। চীন–ভারত মৈত্রীর হাতছানি বুকে নিয়ে তিনি দু’বার সফর করেছিলেন চীন।
জীবনের শেষভাগে ‘মাস সিঙ্গার্স’ দল গঠন করে আবারো গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে গান শুনিয়েছেন শোষিত মানুষের কাছে।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সুরের ভাণ্ডার ছিল অপার।
রাঢ় বাংলার ঝুমুর, বরেন্দ্রীর ভাওয়াইয়া, ব্যাঘ্রতটীর বাগড়ি জারি–সারি, মুর্শিদি, বীরভূমের বাউল, নদীয়ার ফকির বাউল, সিলেটের ধামাইল, হাছনের গানের ধারা— সবকিছুই তিনি নিজের গলায় ধারণ করেছিলেন।
এমনকি গাজীর গান, বাইদ্যার গান, হোরি গানসহ অসংখ্য লোকরাগ ও উপধারায় তিনি সৃষ্টি করেছেন বৈচিত্র্যময় সুরের ভুবন।
‘কল্লোল’, ‘তীর’, ‘লাললণ্ঠন’সহ বহু নাটকের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তিনি। তাঁর সুরে ছিল নদীমাতৃক বাংলার ঘ্রাণ, মাঠ-ঘাটের ধুলো, কৃষকের ঘামের গন্ধ এবং মানুষের অপ্রকাশিত ইতিহাস।
১৯৮৭ সালের ২২ নভেম্বর— ইতিহাসের পাতায় স্থির হয়ে থাকা এই অসামান্য শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
কিন্তু তাঁর গান?
সেগুলো আজও মাঠে-ঘাটে প্রতিধ্বনিত হয়, সংগ্রামী মানুষের মনে আলো জ্বালায়—
কারণ তিনি ছিলেন গণমানুষের শিল্পী, মানুষের স্বপ্ন ও লড়াইয়ের সুরকার।
শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ— হেমাঙ্গ বিশ্বাস।