দক্ষিণ আফ্রিকায় চাঁদা না দেওয়ায় গুলিতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নিহত

দক্ষিণ আফ্রিকায় চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় মারুফ হোসেন (৪৫) নামে এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে। বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে দেশটির কেপটাউনের বুস্টারের জুলুটেম্বা এলাকায় নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। দোকানের ক্যাশে বসে থাকা অবস্থায় তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মারুফের মৃত্যুতে শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার পশ্চিম সিড্যা গ্রামের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে ব্যবসা গড়ে তোলা এই ব্যক্তির আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনেরা ভেঙে পড়েছেন। পরিবারের দাবি, মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগও চান তাঁরা।

নিহত মারুফ হোসেন শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সিড্যা গ্রামের মৃত আব্দুস সোবাহান বেপারির ছেলে। তাঁর এক ছেলে সিফাত হোসেন ও দুই মেয়ে রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবিকার সন্ধানে বহু বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানে ব্যবসা করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। এ বছর তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

চাঁদা নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যার অভিযোগ

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে মারুফের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন তাঁর ভাতিজা কামরুজ্জামান কাউছার। দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত মারুফের ভাই বিল্লাহ হোসেনের বরাত দিয়ে তিনি জানান, বুধবার রাতে দোকানে অবস্থানকালে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি সেখানে আসে। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় দুর্বৃত্তরা মারুফকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, গুলিবিদ্ধ মারুফকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।

কামরুজ্জামান কাউছার জানান, ভোর সাড়ে ৩টার দিকে তাঁর চাচার মৃত্যুর খবর মুঠোফোনে তাঁদের জানানো হয়। খবরটি পাওয়ার পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিদেশের মাটিতে স্বজনের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তাঁরা।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কারণে গত দুই মাস ধরে মারুফ তাঁর দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। পরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আবার কী পরিস্থিতিতে তিনি অবস্থান করছিলেন এবং কী কারণে দুর্বৃত্তরা সেখানে যায়, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চাঁদা আদায়ের জন্য ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে হামলার ঘটনা প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। তবে মারুফের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়, হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল পাওয়া না পর্যন্ত পরিবারের অভিযোগের বাইরে অন্য কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

বাবার মরদেহ দেশে ফেরানোর আকুতি ছেলের

মারুফের ছেলে মো. সিফাত হোসেন বাবার মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন। তাঁর স্মৃতিতে বাবার বিদেশযাত্রার দিনগুলোর কথাও ফিরে এসেছে। সিফাত জানান, তিনি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তেন, তখন তাঁর বাবা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান। সেখানে গিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। বাবার প্রবাসজীবনের দীর্ঘ সময়ে পরিবারকে দেশে রেখেই জীবিকা নির্বাহ করেছেন তিনি।

সিফাতের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার পর আর দেশে ফিরতে পারেননি। বাবার বিদেশযাত্রার পরই তাঁর ছোট বোনের জন্ম হয়। ফলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো তাঁর কাছেও বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন সরাসরি সময় কাটানোর সুযোগ সীমিত ছিল।

সিফাত বলেন, বুধবার রাতে দোকানের ক্যাশে বসে থাকা অবস্থায় সন্ত্রাসীরা তাঁর বাবার বুকে গুলি করে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে তিনি জানতে পেরেছেন।

বাবার মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন সিফাত। পরিবারের সদস্যদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো মরদেহ দেশে এনে শেষবারের মতো বাবাকে দেখা এবং যথাযথভাবে দাফন করা। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবিও তাঁদের।

প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকেন। তাঁদের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে দেশে থাকা সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আকস্মিক মৃত্যু শুধু শোকই নয়, আর্থিক অনিশ্চয়তাও তৈরি করে। মারুফের পরিবারও এখন সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

দক্ষিণ আফ্রিকায় আরেক বাংলাদেশির গুলিতে মৃত্যু

এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৃথক এক ঘটনায় মাহফুজুর রহমান রাজু (৩১) নামে আরও এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে ঘাউটেং প্রদেশের স্প্রিংসের কাছে কোয়াতেমার সোমেমো এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

রাজু নোয়াখালী সদর উপজেলার পশ্চিম মাইজদী এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাড়ি মাইজদী কোর্টের ১ নম্বর ওয়ার্ডে বলে জানা গেছে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) জোহরের নামাজের পর স্প্রিংসের বেকারটন মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যমকর্মী মো. সৌরভ জানিয়েছেন, রাজুর মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় দুই বাংলাদেশির গুলিতে নিহত হওয়ার খবর প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাগুলো পৃথকভাবে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।

মরদেহ প্রত্যাবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি

মারুফের পরিবারের প্রধান চাওয়া, তাঁর মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হোক। এ ধরনের ঘটনায় মরদেহ প্রত্যাবাসনের জন্য সাধারণত স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমতি, মৃত্যুসংক্রান্ত নথিপত্র এবং পরিবহনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। বিদেশে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা কনস্যুলার কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে মারুফ ও রাজুর মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্ত, সন্দেহভাজনদের শনাক্তকরণ কিংবা গ্রেপ্তারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিপদে পড়লে তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় সহায়তা পরিবারের দুর্ভোগ কমাতে পারে।

মারুফের পরিবার এখন তাঁর মরদেহ ফেরার অপেক্ষায়। যে মানুষটি দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁর এমন মৃত্যু স্বজনদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। পরিবারের প্রত্যাশা, দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরবে এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটিত হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত অন্য বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।