এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: 14শে চৈত্র ১৪৩২ | ২৮ই মার্চ ২০২৬ | 1150 Dhu al-Hijjah 5
নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি জরুরি প্রশ্ন আজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—বাংলাদেশে দারিদ্র্য ঠিক কোন মানদণ্ডে নির্ধারিত হয়? কেবল আয় দিয়ে, নাকি মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার অবস্থা দিয়ে?
প্রচলিতভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) দারিদ্র্য নির্ধারণ করে খাদ্য গ্রহণ, ক্যালরি চাহিদা এবং আয়-ভোগ ব্যয়ের ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বব্যাংক দিনে নির্দিষ্ট আয়ের নিচে থাকা মানুষকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এই গড় হিসাবের ভেতরে কি মানুষের জীবনের প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে?
বাস্তব জীবনের দুটি চিত্র আমাদের সামনে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তুলে ধরে। একদিকে, একটি শ্রমজীবী পরিবার—গৃহকর্মী – মাসিকনআয় ১৩০০০/= ,তার রিকশাচালক স্বামী- মাসিক আয়- ১৮০০০/= থেকে ২০.০০০/=, মেয়ে গার্মেন্টস কর্মী – ১৫০০০/= এবং ছোট ছেলে টেম্পুর হেলপার ৮০০০/=
মোটামুটি ঐ পরিবারের মাসিক আয় ৫০ হাজার প্লাস টাকার মতো তারা আয় করে। কম ভাড়া, আংশিক খাদ্য সুবিধা এবং ব্যয় সীমিত রাখার ফলে তারা নিয়মিত সঞ্চয় করতে পারে ( মাসে +-১০০০০/= টাকা) এমনকি কয়েক বছরে গ্রামে জমিও কিনতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন—চাকরি হারানোর ধাক্কা কাটিয়ে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেও তার মাসিক আয় প্রায় ২৮,৫০০ টাকা। রাজধানীতে বাসাভাড়া ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই তাকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। ইতোমধ্যে পারিবারিক সম্পদ বিক্রির মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে।
এই দুই বাস্তবতা আমাদের সামনে মৌলিক প্রশ্ন তোলে—কে বেশি দরিদ্র? যে কম আয় করে কিন্তু সঞ্চয় করতে পারে, নাকি যে তুলনামূলক বেশি শিক্ষিত হয়েও জীবনধারণে হিমশিম খাচ্ছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে একটি নতুন শ্রেণি দৃশ্যমান—“কর্মরত দরিদ্র” বা Working Poor। এরা নিয়মিত আয় করে, কিন্তু উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়—বিশেষ করে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপণ্যের দাম—তাদেরকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এদের বড় একটি অংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত, যারা সামাজিক মর্যাদার কারণে দরিদ্র তালিকায় স্থান পায় না, আবার বাস্তবে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকার ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি পরিবারকে টিসিবি কার্ড এবং নতুন “ফ্যামিলি কার্ড” এর আওতায় এনে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য ও নগদ সহায়তা প্রদান করছে। উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—এই সহায়তা কারা পাচ্ছে? প্রকৃত আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ, নাকি কেবল দৃশ্যমানভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী?
বর্তমান পদ্ধতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো—এটি প্রধানত আয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অথচ একটি পরিবারের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র নির্ভর করে তার ব্যয়, নির্ভরশীল সদস্য সংখ্যা, বাসস্থান ব্যয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ওপর। একই আয় দুই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
এই বাস্তবতায় দারিদ্র্য নির্ধারণের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রথমত, আয়-ব্যয়ের সমন্বিত বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শহর ও গ্রামের জন্য আলাদা দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ জরুরি। তৃতীয়ত, একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করে প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত করা যেতে পারে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।
একসময় দেশে রেশনিং ব্যবস্থা ছিল, যা সাধারণ মানুষের জন্য একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছিল। বর্তমান বাস্তবতায় সেই ধরনের একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর রেশনিং ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত উভয় শ্রেণিই উপকৃত হয়।
দারিদ্র্য কোনো একমাত্রিক ধারণা নয়। এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা, এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যখন একজন দিনমজুর সঞ্চয় করতে পারে, আর একজন শিক্ষিত চাকরিজীবী মাস শেষে ঋণের ভারে ন্যুব্জ হয়—তখন বুঝতে হবে, আমাদের প্রচলিত সংজ্ঞা বাস্তবতার সাথে তাল মিলাতে পারছে না।
এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—
দারিদ্র্য কি শুধুই আয়, নাকি মানুষের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি?
নীতিনির্ধারকদের কাছে তাই বিনীত আহ্বান—সংখ্যার বাইরে এসে মানুষের জীবনের বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিন। তাহলেই হয়তো একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক – খবরওয়ালা ও জি-লাইভ ২৪